ভিনিউজ ডেস্ক : শিশু-কিশোরদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আকৃষ্ট করে দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে বড় ধরনের আইনি লড়াই। ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি আদালতে মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। আগামী ছয় সপ্তাহ ধরে জুরি মেটার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ ও কোম্পানিটির পাল্টা যুক্তি শুনবেন।
মামলাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক। ২০২৩ সালে দায়ের করা মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো অভিযোগ করেছে, শিশুদের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য আইন একাধিকবার লঙ্ঘন করেছে মেটা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের এমন কিছু ফিচার চালু রেখেছে, যেগুলো শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে।
মামলার শুনানিতে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান আইনজীবী মেগান ও’নিল মেটার অভ্যন্তরীণ নথি, কর্মীদের ই-মেইল, গবেষণা ও চ্যাটের তথ্য তুলে ধরেন। এসব নথির কিছু সরাসরি কোম্পানির শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে আদালতকে জানানো হয়।
ও’নিলের দাবি, মেটা জানত যে ইনস্টাগ্রাম কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি কোম্পানির একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল, কিশোরদের একটি অংশ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘আসক্তির মতো’ আচরণ করে। আরেকটি নথিতে বলা হয়েছিল, ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ধরে রাখার জন্য তৈরি ফিচারগুলো তাদের সুস্থতা ও মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবীর অভিযোগ, মেটার ব্যবসায়িক কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যবহারকারীকে আকৃষ্ট করা, যত বেশি সময় সম্ভব ধরে রাখা এবং তাদের তথ্য থেকে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া। একই সঙ্গে জনসমক্ষে প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর দিকগুলো আড়াল করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
বিশেষ করে ১১ ও ১২ বছর বয়সী শিশুদের ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের বিষয়টি আদালতে গুরুত্ব পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষ দাবি করেছে, মেটা জানতে পেরেছিল যে লাখ লাখ ১১ ও ১২ বছর বয়সী শিশু ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করছে, কিন্তু তাদের ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। তবে মেটার পক্ষ এই সংখ্যা প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, এ ধরনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক লাখের কিছু বেশি।
মেটার আইনজীবী পল শ্মিট অবশ্য অভিযোগগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজ্যগুলোর পক্ষ থেকে মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণার কিছু তথ্য বেছে নিয়ে আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক-পঞ্চমাংশ কিশোর জানিয়েছিল, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে তারা খারাপ অনুভব করে। তবে একই গবেষণায় ৪১ শতাংশ কিশোর বলেছিল, ইনস্টাগ্রাম তাদের ভালো অনুভব করায় এবং আরও ৪১ শতাংশের মতে এর কোনো প্রভাব নেই।
মেটা আরও দাবি করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি বলে কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বিষয় নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ও ইনস্টাগ্রামপ্রধান অ্যাডাম মোসেরিও অতীতে বলেছেন, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম আসক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়নি।
অন্যদিকে মেটার বয়স যাচাইয়ের সক্ষমতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির দাবি, শিশুদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেসব গোপনীয়তা আইন রয়েছে, সেগুলোই অনেক ক্ষেত্রে বয়স যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শন এবং অনন্ত স্ক্রল বা ‘ইনফিনিট স্ক্রল’-এর মতো কিছু ফিচারে পরিবর্তন আনারও দাবি জানানো হয়েছে।
এই মামলার রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং প্ল্যাটফর্মের নকশা নিয়ে ভবিষ্যতের আইন ও নীতিমালায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
-bbc




