ভিনিউজ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা সর্বশেষ শুল্কের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা বাড়ল। কানাডার এই পদক্ষেপকে দেশটির সরকার ‘আনুপাতিক’ ও ‘কৌশলগত’ বলে বর্ণনা করেছে।
মঙ্গলবার কানাডার কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বা ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। প্রায় ৯০০ ধরনের পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে কানাডা। এর মধ্যে রয়েছে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম, আসবাবপত্র, পোশাক, প্রসাধনী, মধু, সামুদ্রিক খাবারসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য ও শিল্পপণ্য।
কানাডার তালিকায় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই হারে শুল্ক বসানো হয়েছে প্রাকৃতিক মধু, আসবাবপত্র, পোশাক, প্রসাধনী ও সুগন্ধির মতো পণ্যে। ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন, পনির ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাবার এবং নির্দিষ্ট কিছু ধাতব পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া ফর্কলিফট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ কিছু সরঞ্জামের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডীয় পণ্যের ওপর যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে, তারই জবাবে এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, মার্কিন শুল্ক কানাডার শ্রমিক, ব্যবসা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর বাস্তব প্রভাব ফেলবে। তাই কানাডার পদক্ষেপ একই সঙ্গে সমানুপাতিক ও কৌশলগত।

শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কানাডীয় ব্যবসা ও শ্রমিকদের সহায়তায় অতিরিক্ত ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কর্মী ছাঁটাই কমানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করাই এই অর্থের মূল উদ্দেশ্য।
তবে কানাডার পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর হোয়াইট হাউসও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু কানাডা ‘অযৌক্তিক দাবি’ ও আগের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডার সমালোচনা করে দেশটিকে ‘কঠিন ও অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেন, কানাডা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে এবং মার্কিন কৃষকদের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। একই সঙ্গে তিনি কানাডীয় গাড়ির ওপর মার্কিন শুল্ক আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন।
জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ধ্বংস করতে চাইছে। যদিও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে, মঙ্গলবার উভয় পক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা তুলনামূলক কূটনৈতিক সুরে কথা বলেছেন। ফলে ভবিষ্যতে আবারও বাণিজ্য আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দুই দেশের এই বাণিজ্য সংঘাত উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য কাঠামো ইউএসএমসিএর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মেক্সিকোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম জরুরি আলোচনার জন্য তাঁর অর্থমন্ত্রীকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছেন।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন শুল্কের কারণে বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যযুদ্ধ হলে সীমান্তের উভয় পাশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কানাডার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরি করেছে। এখন নজর থাকবে-দুই দেশ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়, নাকি এই পাল্টা শুল্কই দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা করে।




