ভিনিউজ : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য বিরোধ ক্রমেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে কানাডার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও, প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকারও বসে নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর কানাডার যে কৌশলগত প্রভাব রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে চাপ তৈরি করতে চাইছে অটোয়া।
কানাডা তার মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক কানাডার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির জন্য কানাডা শীর্ষ তিন রপ্তানি বাজারের একটি। মেইন, মিশিগান ও উইসকনসিনসহ ২৬টি অঙ্গরাজ্যের পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতাও কানাডা। ফলে বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকেও মূল্য দিতে হতে পারে।
কার্নি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাবে ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছেন। ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষিযন্ত্র, ইলেকট্রনিকস, পাল্প ও কাগজসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি হতে পারে বড় অস্ত্র
কানাডার হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্রগুলোর একটি হলো জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের বড় অংশ কানাডা সরবরাহ করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ আসে কানাডা থেকে।
কার্নি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই চাইবে না কানাডা এসব জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিক। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডও ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে জ্বালানিতে অতিরিক্ত মাশুল আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
২০২৫ সালে ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা কানাডীয় বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কানাডীয় সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এতে মিশিগান, মিনেসোটা ও নিউইয়র্কের প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রভাবিত হতে পারত।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজেও নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্র
পটাশ, লিথিয়াম, নিকেল ও গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কাঁচামালের ক্ষেত্রেও কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। বিশেষ করে সার উৎপাদনে ব্যবহৃত পটাশের ক্ষেত্রে কানাডা বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎস।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কানাডীয় পণ্য ও খনিজ সরবরাহের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি বুঝতে বাধ্য করা হবে।
কানাডা থেকে রপ্তানি হওয়া খনিজের সবচেয়ে বড় গন্তব্যও যুক্তরাষ্ট্র। তাই এই খাতেও সরবরাহ সীমিত করা বা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে মার্কিন শিল্পে চাপ তৈরি হতে পারে।
মার্কিন পণ্যে কানাডীয় বয়কটের প্রভাব
কানাডা এরই মধ্যে দেখিয়েছে, শুধু সরকারি শুল্ক নয়—ভোক্তাদের বয়কটও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের মদের দোকান থেকে মার্কিন অ্যালকোহল সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর ফলে কানাডায় মার্কিন ওয়াইনের রপ্তানি বছরে প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে যায়। এতে প্রায় ৩৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতি হয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানিয়েছে। মার্কিন ডিস্টিলারদের সংগঠনও জানিয়েছে, কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন মদজাতীয় পানীয়ের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে।
কানাডীয়দের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ এড়িয়ে চলার প্রবণতাও তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এপ্রিল মাসে প্রায় আট লাখ কম কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। ভ্রমণ কমে যাওয়ায় গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার রাজস্ব হারানোর হিসাবও রয়েছে।
ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ছে
বাণিজ্য বিরোধ শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক চাপও তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মিশিগান ও মেইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে কানাডা বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের বর্তমান বৈশ্বিক শুল্কনীতির কারণে মার্কিন পরিবারপ্রতি বছরে প্রায় ১,১০০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নিলে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে এবং মার্কিন ব্যবসা ও শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির যুক্তি, কানাডীয় গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক বাড়ানো হলে শুধু কানাডা নয়, মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি ও আলাবামার মার্কিন শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ এসব অঙ্গরাজ্যের শিল্পের সঙ্গে কানাডার সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
অন্যদিকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি সতর্ক করেছেন, শুল্কের প্রভাব মার্কিন ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে—বাড়ি নির্মাণের উপকরণ থেকে শুরু করে মেঝে, ফুল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম পর্যন্ত।
সব মিলিয়ে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ছোট অর্থনীতি হলেও একেবারে অসহায় নয়। জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃষি ও শিল্পপণ্য, ভোক্তা বাজার এবং সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক—এসবই অটোয়ার হাতে গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরির উপায়। তবে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কানাডার অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কার্নি সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ দেওয়া, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডার সাফল্য নির্ধারণ করতে পারে।


