পুঁজিবাজার: ধারাবাহিক দর পতনে পতনে চিন্তিত বিনিয়োগকারীরা
বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন থামছে না। ধারাবাহিক পতনে বিনিয়োগকারীদের লোকসানও বাড়ছে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২২ দশমিক ৭১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৭ পয়েন্টে নেমেছে। একই সঙ্গে কমেছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম। চলতি মাসের শুরু থেকেই বাজারে দুর্বল প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ৩ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৬৬২ দশমিক ০৯ পয়েন্ট। বৃহস্পতিবার তা নেমে এসেছে ৫ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৭ পয়েন্টে। অর্থাৎ ছয় কার্যদিবসে সূচক কমেছে ১৪৬ দশমিক ৯২ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
দীর্ঘদিনের মন্দার পর চলতি বছরের শুরুতে শেয়ারবাজারে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। এর প্রভাবে একপর্যায়ে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে ওঠে। এতে দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কিছুটা কমেছিল। তবে সেই পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। প্রায় এক মাস বাজারে দুর্বল প্রবণতা চলছে। সপ্তাহের শুরুতে তীব্র বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ার পর মাঝামাঝি সময়ে কম দামে শেয়ার কেনার চেষ্টা দেখা গেলেও তা বাজারকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকলেও শেষভাগে বিক্রির চাপ বাড়ে। দিন শেষে ১০৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ২৩০টির দাম কমেছে এবং ৫৪টির অপরিবর্তিত ছিল। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৬৭টির দাম বেড়েছে, ১০৭টির কমেছে এবং ২০টির অপরিবর্তিত ছিল। ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৬টির দাম বেড়েছে, ৬৫টির কমেছে এবং ৩টির অপরিবর্তিত ছিল।
‘জেড’ গ্রুপের ২৯টির দাম বেড়েছে, ৫৮টির কমেছে এবং ৩১টির অপরিবর্তিত ছিল। ৩২টি মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বেড়েছে এবং একটির কমেছে।
বৃহস্পতিবার ডিএস-৩০ সূচক ৭ দশমিক ৬২ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৯৫ দশমিক ৩১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫.০৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১১০৫.০৬ পয়েন্টে। সূচক কমলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। দিন শেষে লেনদেন হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। আগের কার্যদিবসে হয়েছিল ৫১৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ লেনদেন বেড়েছে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এদিন মোট ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৯টি লেনদেনে ২১ কোটি ৭৬ লাখ ৪২ হাজার ৬৬টি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। লেনদেনের শীর্ষে ছিল এনভয় টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ২০ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের ১৯ কোটি ১৩ লাখ এবং এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ১৬ কোটি ৩১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, সায়হাম টেক্সটাইল, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, মালেক স্পিনিং, নিটল ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৫টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৯০টির দাম কমেছে এবং ২৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১ পয়েন্ট কমেছে। এদিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে হয়েছিল ৮৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং এর সম্ভাব্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে। তবে দরপতনের সুযোগে কম দামে শেয়ার কেনার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। শেলটেকের বিশ্লেষণে বাজারের ব্রেডথ বা দর বাড়া-কমার অনুপাত শূন্য দশমিক ১৯ গুণে নেমে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রোকারেজ হাউসটির মতে, কম লেনদেনের মধ্যেও ব্যাপক বিক্রির চাপ বাজারের দুর্বল অবস্থাকে নির্দেশ করছে।
ডিএসইর খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে সিরামিক খাতে—৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে মোট লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বস্ত্র খাত ২৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এরপর বীমা খাত ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাত ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ অবদান রেখেছে। সামনের দিনের বাজার সম্পর্কে শেলটেকের পর্যবেক্ষণ, কম দামে শেয়ার কেনার প্রবণতা ব্যাপক ক্রয়চাহিদায় পরিণত হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, বিএসইসি চেয়ারম্যানের প্রস্তাবিত পুঁজিবাজার উন্নয়ন উদ্যোগের অগ্রগতি, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি এবং জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর আয় ও লভ্যাংশ ঘোষণা স্বল্পমেয়াদে বাজারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনিয়োগকারী হাফিজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, দিনের পর দিন শেয়ারের দাম কমছে। আমাদের পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ছোট বিনিয়োগকারীদের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে যাবেন।
একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কালবেলাকে বলেন, বিএসইসির নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মার্জিন রুল পরিবর্তনসহ কমিশন চেয়ারম্যানের বিভিন্ন বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। এতে বিক্রির চাপ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে।




