নাটকের সূত্রে রাজনীতিতে হাতেখড়ি , ভারতের ছাত্র আন্দোলনের নতুন মুখ কে এই নেহা বোরা?

নাটকের সূত্রে রাজনীতিতে হাতেখড়ি , ভারতের ছাত্র আন্দোলনের নতুন মুখ কে এই নেহা বোরা?

ভিনিউজ ডেস্ক: বয়স এখনও ত্রিশ পেরোয়নি। অথচ ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আটক হওয়া, গায়ে কালি ছোড়া, এমনকি প্রাণনাশের হুমকির মুখেও পড়েছেন তিনি। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁকে প্রতিবাদের ময়দান থেকে সরাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ঘটনার পর আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে এসেছেন আন্দোলনে। ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে ক্রমশ পরিচিত হয়ে ওঠা এই তরুণ মুখের নাম নেহা বোরা। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ)-এর সভানেত্রী নেহা এখন শুধু ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক নন, শিক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদের অন্যতম মুখ।

২০২৬ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান নেহা। পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সরকারের দায় স্বীকার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল তার ২৩ দিনের অনশন। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে রাজধানীতে এই দীর্ঘ অনশনে অংশ নেন নেহা। টানা অনশনের কারণে একপর্যায়ে তাঁর শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে।

নিট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে তাঁর প্রতিবাদ জাতীয় আলোচনায় আসে। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা যায় তাকে। কখনও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সমালোচনা, কখনও ভোটাধিকার রক্ষার দাবি, আবার কখনও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির পক্ষে অবস্থান , বিভিন্ন ইস্যুতে সরব থেকেছেন এই ছাত্রনেত্রী।

সর্বশেষ ১০ অক্টোবর শনিবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে অংশ নেন নেহা। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে দিল্লি পৌঁছানোর পর দলটির নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে পুলিশ। এরপর আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেন নেহা।

দুপুর ১টার পর সহযোগীদের নিয়ে মিছিল বের করেন তিনি। যন্তর মন্তরে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার কারণে বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করে দিল্লি হাটে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মিছিলের মাঝপথেই নেহাকে আটক করে পুলিশ। তাকে একটি বাসে তুলে নেওয়া হলে বাসটি ঘিরে বিক্ষোভ দেখান আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনা আবারও আলোচনায় নিয়ে আসে দিল্লিতে প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাতের প্রশ্ন।

তবে নেহার রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু সাম্প্রতিক এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নয়। তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি নাটকের মঞ্চে। নেহার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, নাটকই তাঁকে রাজনীতিকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে। রাজনীতি যে কেবল নির্বাচন, রাজনৈতিক দল কিংবা ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের প্রতিদিনের জীবন, অধিকার ও সুযোগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছিল নাটকের সূত্রেই।

শিক্ষার সুযোগ কারা পাবেন, কারা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হবেন, কার মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার অধিকার কারা পাবেন, এসব বিষয়েই রাজনীতির উপস্থিতি রয়েছে বলে মনে করেন নেহা। নাটকের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া এই বোধই ধীরে ধীরে তাঁকে ছাত্ররাজনীতি ও প্রতিবাদের জগতে নিয়ে আসে।

নেহা উত্তরাখণ্ডের মেয়ে। তার বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বাবার কর্মসূত্রে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে। শিলিগুড়িতে পড়াশোনা করেছেন তিনি। সেখানেই মাধ্যমিক, একাদশ ও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড এস্থেটিকসে পিএইচডি করছেন।

নেহার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কলকাতায় এসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বাংলার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন। তার মতে, পশ্চিম বাংলার মাটিতে না এলে হয়তো চারু মজুমদারের নাম জানা হতো না, পাবলো নেরুদার কবিতার সঙ্গে পরিচয় ঘটত না, কিংবা অরুন্ধতী রায়ের লেখাও পড়া হয়ে উঠত না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাকে প্রথম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে শিখিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন নেহা। তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপির ক্ষমতায় আসাকে তিনি রাজ্যের মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশার পরিণতি হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, তৃণমূলের শাসনামলে মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়েই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা প্রকাশ পেয়েছে।

নেহার রাজনৈতিক অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাগরিক অধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্নে তাঁর সক্রিয়তা। ২০২০ সালের দিল্লির সহিংসতার ঘটনায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএতে আটক উমর খালিদের মুক্তির দাবিতে সরব হয়েছেন তিনি। একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেহা জানিয়েছেন, তিনি এবং তার সংগঠন এআইএসএ উমর খালিদের মুক্তিকে সমর্থন করেন।

একইভাবে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ইউএপিএতে আটক শারজিল ইমামের মুক্তির পক্ষেও বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। এসব অবস্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিয়ে চলমান বিতর্কে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এই ছাত্রনেত্রী।

নেহার উত্থানকে কেবল একজন তরুণ নেত্রীর জনপ্রিয়তা অর্জনের গল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারতের তরুণদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, তাকে সংগঠিত প্রতিবাদের ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তার বক্তব্যে স্পষ্ট বামপন্থী আদর্শ এবং আন্দোলনের মঞ্চে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির দাবি।

ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে নেহা বোরা কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, গণতন্ত্রে তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার অধিকার কতটা সুরক্ষিত? সংঘাত, আটক ও হুমকির মধ্যেও আন্দোলনে ফিরে আসা নেহার রাজনৈতিক উত্থান সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

পূর্বের খবরডয়েসে ভেলের প্রতিবেদন : ইউরোপমুখী নিঃসঙ্গ অভিবাসী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!