বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেল বা নবম পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন কাঠামোয় মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে একসঙ্গে পুরো বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হবে না। আর্থিক সক্ষমতা, বাজেটের ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই নতুন বেতন কাঠামোতে ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। নতুন স্কেলে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বাড়বে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

নতুন পে-স্কেল কার্যকর ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে পুরো বেতন কাঠামো একযোগে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মোট তিন ধাপে মূল বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে নতুন স্কেলের পুরো সুবিধা পেতে সরকারি কর্মচারীদের কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হলো একসঙ্গে বেতন বাড়ালে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মূল বেতনের পাশাপাশি নতুন পে-স্কেলে বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন। এত দিন নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে ৫ম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মীরা এ সুবিধা পেতেন। সরকারি কাজে ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সব গ্রেডের কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য ভাতা চালু করা। প্রথমবারের মতো যোগ্য সরকারি কর্মচারীদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে বিশেষ ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিচর্যা ও অন্যান্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সুবিধা চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার। এর ফলে প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে—এমন সরকারি কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামো থেকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পাবেন।

নতুন পে-স্কেলে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনামূলক বেশি হারে নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন ফর্মুলা অনুযায়ী, মাসে ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বৃদ্ধি হবে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বাড়বে ৬৫ শতাংশ। এ ছাড়া ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং বর্তমানে তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) ব্যবস্থা এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বেশি হারে পেনশন বাড়ানোর ফর্মুলা কার্যকর করা হচ্ছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন। নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকারের মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক বা এমটিবিএফ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।
এদিকে বিচার বিভাগীয় কর্মীদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য ইতোমধ্যে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের নতুন বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে। এটিও ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রায় ১১ বছর পর নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলো। এখন প্রজ্ঞাপন জারির পর ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। সরকারের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক দায় হলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামোটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।




