জিনিউজ : মাত্র ১৩ বছরেই ৪৩-এর পরিচালককে বিয়ে, পরিবর্তন করেন ধর্মও: একলা মা হিসেবে লড়াই
ভিনিউজ ডেস্ক ; ‘এক দো তিন’ থেকে ‘ডোলা রে ডোলা’—দুই হাজারেরও বেশি গানে দর্শকদের মন জয় করা এই মানুষটির পেশাদার জীবন যতটাই উজ্জ্বল ছিল, ব্যক্তিগত জীবন ছিল ততটাই অন্ধকার ও যন্ত্রণাময়। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম- সরোজ খান।
১৯৪৮ সালে মুম্বইয়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন সরোজ খান, যার পারিবারিক নাম ছিল নির্মলা নাগপাল। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার চরম সংকটে পড়েছিল, যার ফলে মাত্র কয়েক বছর বয়সেই শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁকে কাজ শুরু করতে হয়। কিন্তু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর। সেই সময়েই তাঁর দেখা হয় প্রখ্যাত নৃত্য পরিচালক বি. সোহনলালের সঙ্গে।
সরোজ খানের নিজের বয়ান অনুযায়ী, ১৩ বছর বয়সে সোহনলাল তাঁর গলায় একটি কালো সুতো বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে ছোট নির্মলা (পরবর্তীতে সরোজ) বিয়ের অর্থ বুঝতেন না। তিনি ভেবেছিলেন এটাই বোধহয় বিয়ে। সোহনলাল ছিলেন তাঁর চেয়ে ৩০ বছরের বড়। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য থেকেই নির্মলা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন সরোজ খান।
বিয়ের এক বছর পরেই, অর্থাৎ মাত্র ১৪ বছর বয়সে সরোজ খান প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। আর ঠিক সেই সময়েই তিনি জানতে পারেন এক ভয়ঙ্কর সত্য। সোহনলাল কেবল বিবাহিতই ছিলেন না, তাঁর আগের পক্ষে চারটি সন্তানও ছিল। এই বিশ্বাসভঙ্গ সরোজ খানের জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সোহনলাল তাঁর সন্তানদের নিজের নাম দিতেও অস্বীকার করেছিলেন। এরপর বেশ কিছুকাল টানাপোড়েনের পর তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।
সন্তানদের নিয়ে যখন সরোজ খান একলা লড়াই করছিলেন, তখন ১৯৭৫ সালে তাঁর জীবনে আসেন সরদার রোশন খান। তিনি সরোজকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সরোজ একটি শর্তই রেখেছিলেন—রোশনকে তাঁর পূর্বের সন্তানদের আপন করে নিতে হবে। রোশন রাজি হন এবং এরপর থেকেই সরোজ খান এক স্থিতিশীল ব্যক্তিগত জীবনের স্বাদ পান। তাঁদের একটি কন্যা সন্তানও হয়, যার নাম সুকায়না। তবে ব্যক্তিগত শোক তাঁর পিছু ছাড়েনি; এক কন্যাকে তিনি শিশু বয়সেই হারান এবং আরেক মেয়ে কুকু ৩৯ বছর বয়সে মারা যান।
ব্যক্তিগত জীবনের এই বিপুল ঘাত-প্রতিঘাতকে সরোজ খান তাঁর কাজে কখনও প্রভাব ফেলতে দেননি। শারীরিক যন্ত্রণা বা মানসিক কষ্ট থাকলেও ক্যামেরার সামনে তিনি ছিলেন আপসহীন। সঞ্জয় লীলা বনশালি একবার বলেছিলেন, হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও সরোজ খানের প্রথম চিন্তা ছিল মানুষ তাঁর কাজকে কতটা ভালোবাসা দিচ্ছে।
সরোজ খান আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর ফেলে যাওয়া ২০০০ গানের কোরিওগ্রাফি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। একজন একলা মা হিসেবে তাঁর লড়াই এবং একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর উত্তরণ আজও অগণিত নারীর অনুপ্রেরণা।




