গণভোটসহ ২০ অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাল

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বৈধতাকরণের কাজ শেষ করেছে জাতীয় সংসদ। রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ-সংক্রান্ত ও জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তিসহ ১১৩টি অধ্যাদেশকে ৮৭টি বিল পাসের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চারটি পৃথক বিল পাসের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ ৭টি অধ্যাদেশকে বাতিল করা হয়েছে।

অন্যদিকে বহুল আলোচিত গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বাকি ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদের অনুমোদন পায়নি। ফলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি আজ থেকে কার্যকারিতা হারাল।

গতকাল শুক্রবার বিল পাসের শেষ দিকে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে।

রোববার থেকে গতকালসহ টানা ছয় দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করেছে। দেশের জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে এতসংখ্যক বিল পাসের নজির নেই। গতকালই ২৪টি বিল পাস হয়। এর আগে ৯ এপ্রিল ৩১টি, ৮ এপ্রিল ১৩টি, ৭ এপ্রিল ১৪টি, ৬ এপ্রিল ৭টি এবং ৫ এপ্রিল ২টি বিল পাস হয়।

রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ ৭টি অধ্যাদেশে গৃহীত কার্যক্রমের সুরক্ষা দেওয়া হলেও গণভোট, দুদক, গুমসহ ১৩টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে কোনো সুরাহা আসেনি। ফলে এসব অধ্যাদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সুরক্ষা কী হবে, তা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘গণভোট ২০২৬’সহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হলো বলে মনে করা হচ্ছে।

সংসদ চলমান না থাকাকালে রাষ্ট্রপতি যেসব অধ্যাদেশ জারি করেন, তা সংসদের অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না করলে অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। বিধান অনুযায়ী গতকালই ছিল অধ্যাদেশগুলো সংসদে নিষ্পত্তির শেষ সময়। গত ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন শুরুর দিনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে এ ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করেন।

পরে অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়। বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ২ এপ্রিল সংসদে প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু ও ১৫টি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া ৪টি বাতিল ও ১৬টি পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাইসহ অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

বিশেষ কমিটির সুপারিশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ থাকলেও এর বাইরে গিয়ে সংসদে বিল তুলে অধ্যাদেশটি রহিতকরণ করে শেখ হাসিনার আমলে তৈরি করা মানবাধিকার কমিশন আইনকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। অপর দিকে কমিটির প্রতিবেদনে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে সংশোধিত আকারে বিল পাসের সুপারিশ করা হলেও অধ্যাদেশটি তোলাই হয়নি। সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করেছিল কমিটি। কিন্তু জারি করা অধ্যাদেশটি হুবহু উত্থাপন করে পাস করে সংসদ। এর আওতায়ই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

অন্যদিকে বিশেষ কমিটিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সুপারিশ হলেও শেষ দিনে তোলা এ-সংক্রান্ত বিলটি সংশোধিত আকারে পাস হয়। সরকারি দলের একজন সদস্যের সুপারিশে এই বিলে তিনটি সংশোধনী গ্রহণ করে তা সংশোধিত আকারে পাস হয়। বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিলটি সংশোধন হওয়ার কারণে বিরোধী দল এর তীব্র প্রতিবাদ করে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আপনার সামনে (স্পিকারের) দিনদুপুরে ছলচাতুরী ও জোচ্চুরির মাধ্যমে সংসদে পাস করা হয়েছে।’ নাহিদের বক্তব্যের জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এ সময়ে সমঝোতা ভঙ্গের বিষয়টি স্বীকার করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তবে তিনি দাবি করেন, বেসরকারি সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাবের ফলেই এই সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে। তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীরা। এর আগে তাঁরা স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

সংসদে উত্থাপন হলেও আইনি সুরক্ষা না দেওয়ার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের যে ১৩টি অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে আজ থেকে কার্যকারিতা হারাচ্ছে, সেগুলো হলো—গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত ২টি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ। সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে যেসব অধ্যাদেশ রহিতকরণ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সুপ্রিম বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত, জাতীয় সংসদ সচিবালয়-সংক্রান্ত এবং মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত।

শেষ দিনের ২৪ বিল

শেষ দিন গতকাল পাস হওয়া ২৪টি বিল হলো—গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের উত্থাপিত নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল এবং রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর উত্থাপিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর উত্থাপিত বাংলাদেশ বনশিল্প করপোরেশন বিল এবং বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল; অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উত্থাপিত আমানত সুরক্ষা বিল; দ্য এক্সসাইজ অ্যান্ড সল্ট (সংশোধন) বিল; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল; গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল; বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল; ব্যাংক রেজল্যুশন বিল এবং অর্থ (২০২৫-২৫) অর্থবছর বিল; শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের উত্থাপিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল; বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম উত্থাপিত জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল এবং সাইবার সুরক্ষা বিল; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উত্থাপিত মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের উত্থাপিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল; সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন উত্থাপিত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংরক্ষণ) বিল; মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান উত্থাপিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল।

পূর্বের খবরলন্ডন হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেনের পদত্যাগ
পরবর্তি খবরআরব সাগরে বাংলাদেশিসহ ১৮ নাবিককে উদ্ধার করল পাকিস্তান নৌবাহিনী
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!