বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ ডেস্ক : বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন পর্তুগালের কিংবদন্তি ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। টেক্সাসের হিউস্টনে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে সমালোচকদের জবাব দিয়েছেন তিনি। ম্যাচের পর টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রোনালদোর উচ্ছ্বসিত উচ্চারণ ছিল, “আমি ফিরে এসেছি।”
বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার, সফল ব্যবসায়ী এবং বিলিয়নিয়ার হিসেবে পরিচিত হলেও রোনালদোর শুরুর জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ১৯৮৫ সালে পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপে একটি শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা স্থানীয় একটি ফুটবল ক্লাবের কিট ম্যানেজার ও মালি ছিলেন, আর মা কাজ করতেন রাধুনী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সীমিত ছিল। দুই কক্ষের ছোট্ট একটি বাসায় তিন ভাইবোনের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন রোনালদো। তবে তিনি কখনও নিজের শৈশবকে দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেননি; বরং সেই সময়কেও সুখের স্মৃতি হিসেবেই মনে করেন।

খুব অল্প বয়সেই ফুটবলের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তার। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন তিনি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে এক শিক্ষকের সঙ্গে বিরোধের ঘটনায় স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন। সেই ঘটনার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের পুরো মনোযোগ ফুটবলে নিবেদন করবেন। তবে তার পথ সহজ ছিল না। ১৫ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের একটি জটিল সমস্যা ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচার করতে হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আবার অনুশীলনে ফিরে আসেন।
রোনালদোর সাফল্যের পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, রয়েছে অসাধারণ পরিশ্রম ও আত্মনিবেদন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি ‘সবার আগে মাঠে আসা এবং সবার শেষে মাঠ ছাড়ার’ নীতি অনুসরণ করেছেন। নিয়মিত অনুশীলন, কঠোর শৃঙ্খলা এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। এর ফল হিসেবে তিনি জিতেছেন পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা এবং গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড।
ফুটবলে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও
রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় তিনি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ক্রীড়া তারকাদের একজন হয়ে ওঠেন। এর ফলে একের পর এক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক চুক্তি হয়। নাইকি, কোকা-কোলা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মুখ হয়ে বিপুল পরিমাণ আয় করেন তিনি।
তবে শুধু ব্র্যান্ডের দূত হয়ে থাকেননি রোনালদো। নিজের নামের আদ্যক্ষর ও জার্সি নম্বর মিলিয়ে গড়ে তোলেন ‘সিআর-সেভেন’ ব্র্যান্ড। প্রথমে অন্তর্বাস বাজারজাত করার মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও পরে তা ফ্যাশন, সুগন্ধি, হোটেল, জিম এবং জাদুঘর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার ব্যবসায়িক কৌশল ছিল স্পন্সরশিপের বাইরে গিয়ে নিজস্ব পণ্য ও সেবার মালিকানা তৈরি করা।

ক্যারিয়ারের শেষ ভাগেও রোনালদো সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। যেখানে অধিকাংশ ফুটবলারের পারফরম্যান্স বয়সের সঙ্গে কমে যায়, সেখানে ৪১ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন। ৩৭ বছর বয়সে সৌদি আরবের আল-নাসরে যোগ দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ক্রীড়া চুক্তিগুলোর একটি করেন। এর আগে তিনি এক বিলিয়ন ডলার আয়ের মাইলফলকও অতিক্রম করেছিলেন।
সংগ্রাম, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার সমন্বয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আজ শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক।




