কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে নতুন উত্তেজনা

 

ভিনিউজ ডেস্ক : কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রো-এর বিরুদ্ধে প্রায় তিন দশক পুরোনো একটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় হত্যার অভিযোগ এনে নতুন করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৬ সালে কিউবা ও ফ্লোরিডার মাঝামাঝি আকাশসীমায় কিউবান-আমেরিকান সংগঠন “ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ”-এর দুটি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার ঘটনায় তিনজন মার্কিন নাগরিকসহ চারজন নিহত হন। সেই ঘটনার জন্যই এখন রাউল কাস্ত্রো এবং আরও কয়েকজন কিউবান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র, বিমান ধ্বংস এবং একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনার সময় রাউল কাস্ত্রো কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে তখনও এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় পঁচানব্বই বছর বয়সী এই নেতা কিউবার সক্রিয় রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও দেশটির বিপ্লবী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, প্রতিটি হত্যার অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

মিয়ামিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা টড ব্ল্যাঞ্চ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগগুলোর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৃত্যুর বিচার আদায়ে পিছিয়ে যাবে না। একইসঙ্গে তিনি জানান, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। যদিও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার বিষয়ে সরাসরি কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি, তবুও মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

এই অভিযোগ প্রকাশের পর কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনি ভিত্তিহীন পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন। তার অভিযোগ, কিউবার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে চাপ সৃষ্টি করে আসছে, এই মামলা তারই অংশ। কিউবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও ঘটনাটিকে “মিথ্যা অভিযোগ” বলে আখ্যা দিয়েছে।

দিয়াজ-কানেল দাবি করেন, ১৯৯৬ সালের ঘটনাটি কিউবার নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষার অংশ ছিল এবং তাদের জলসীমা লঙ্ঘনের জবাব হিসেবেই সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতোই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈরিতা এই মামলার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে চলে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগ শুধু একটি পুরোনো ঘটনার বিচার নয়; বরং কিউবার ওপর আরও রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল সরবরাহে বাধা এবং নানা ধরনের অবরোধ জারি রেখেছে। এর ফলে দেশটিতে খাদ্য সংকট, জ্বালানি সমস্যা এবং দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি কিউবার জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, কিউবার সামরিক নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো দেশের সংকটের জন্য দায়ী। তিনি নতুন সম্পর্কের প্রস্তাব দিলেও তার বক্তব্যে কিউবার শাসকদের প্রতি কঠোর সমালোচনা ছিল।

অন্যদিকে, কিউবার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে “সমষ্টিগত শাস্তি” দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। দেশটির নেতারা বলছেন, অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে এবং এই নতুন মামলা সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

মিয়ামিতে বসবাসরত কিউবান নির্বাসিতদের একটি বড় অংশ অবশ্য এই মামলাকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, বহু বছর ধরে কিউবার শাসকদের বিরুদ্ধে বিচার হয়নি। নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও এটিকে ন্যায়বিচারের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অনেকে মনে করেন, অনেক দেরিতে হলেও ইতিহাসের একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের বিচার শুরু হলো।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই মামলা ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের কারণ হতে পারে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরো-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সঙ্গে এ ঘটনার তুলনাও টানা হচ্ছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, দুই ঘটনার প্রকৃতি ভিন্ন।

সব মিলিয়ে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ কেবল একটি পুরোনো বিমান ভূপাতিত করার ঘটনার বিচার নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের নতুন অধ্যায়। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করবে এই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এবং কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

 

পূর্বের খবরপরমব্রত ও স্বস্তিকার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের