সুমন রায়হান
মন্তব্য প্রতিবেদন
ভিনিউজ : মাত্র আড়াই মাসেরও কম সময়ে একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই তরুণদের প্ল্যাটফর্ম অল্প সময়ের মধ্যেই অনলাইন থেকে নেমে আসে রাজপথে। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি, নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভকে সংগঠিত করে তারা এমন এক আন্দোলন গড়ে তোলে, যার পরিণতিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এই ঘটনাকে অনেকেই ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ গণআন্দোলনের একটি হিসেবে দেখছেন।
সিজেপির জন্ম ১৬ মে ২০২৬। তার আগের দিন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিতে তথাকথিত সমাজ সৈনিক ও বেকারদের ‘আরশোলা’ এবং ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সেই প্রতিবাদ থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মের সূচনা হয়। শুরুতে এটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কনটেন্টের মাধ্যম, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবের আন্দোলনে রূপ নেয়।
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করা অভিজিৎ দীপকে। তিনি আগে আম আদমি পার্টির ডিজিটাল প্রচারে যুক্ত ছিলেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষারত অবস্থান থেকে দেশে ফিরে তিনি নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। দ্রুতই তাঁর পাশে দাঁড়ান সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং বহু তরুণ-তরুণী। সিজেপির দাবি ছিল-শুধু দুর্নীতির তদন্ত নয়, এর রাজনৈতিক দায়ও সরকারকে নিতে হবে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া অবস্থান কর্মসূচি দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আন্দোলনে যোগ দেন লাদাখের শিক্ষাকর্মী সোনম ওয়াংচুকও। দীর্ঘ অনশন, পুলিশি বাধা, লাঠিচার্জ এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও আন্দোলনকারীরা অবস্থান থেকে সরে যাননি। সরকার প্রথমে কঠোর অবস্থান নিলেও পরে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের প্রথম বড় সাফল্য আসে।
তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু একটি পদত্যাগ নয়; বরং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষা। সিজেপি নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচয় দিতে চায় না। তারা নিজেদের তরুণদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যঙ্গ, মিম সংস্কৃতি এবং সরাসরি গণআন্দোলন-সবকিছুর সমন্বয় ঘটেছে। তাদের ঘোষিত ইস্তাহারেও প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রূপ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের নানা প্রস্তাব উঠে এসেছে।
ভারতের রাজনীতির জন্য এই ঘটনার তাৎপর্য গভীর। প্রথমত, এটি দেখিয়ে দিল যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল প্রচারের মাধ্যম নয়; সঠিক ইস্যু সামনে এলে সেটি বাস্তব আন্দোলনের শক্তিশালী সংগঠকও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, সিজেপির উত্থান তারই প্রতিফলন। প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে থেকেও জনসমর্থন অর্জন করা সম্ভব-এই বার্তাই তারা দিয়েছে।
তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এক বিষয়, আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আন্দোলনের আবেগ কমে গেলে সংগঠন, নীতি, অর্থায়ন এবং নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এই নতুন প্ল্যাটফর্মকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করারও চেষ্টা করতে পারে।
ভারতের ইতিহাসে জেপি আন্দোলন, অন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা আম আদমি পার্টির উত্থানের মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, গণআন্দোলন কখনও রাজনৈতিক বিকল্প সৃষ্টি করতে পারে, আবার কখনও সময়ের সঙ্গে তার গতি হারায়। সিজেপির ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে তারা প্রতিবাদের ভাষা থেকে কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কতটা সফলভাবে এগোতে পারে তার ওপর।
‘আরশোলা’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল যাদের, তারাই শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে এটাই এই ঘটনার সবচেয়ে বড় বার্তা। ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের নতুন অংশগ্রহণ, ডিজিটাল আন্দোলনের শক্তি এবং জবাবদিহির দাবি আগামী দিনেও আরও জোরালো হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-ভারতের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্ম তাদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে, আর সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।




