ভিনিউজ ডেস্ক
দুর্নীতি, সরকারি অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের শুরু করা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিয়েছে। প্রায় দুই বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে আলেকজান্ডার ভুচিচের ১৪ বছরের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। সংসদীয় নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ বা ছাত্র তালিকা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রাথমিক নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত তালিকা পেয়েছে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে, ভুচিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। এই ফলকে ভুচিচ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অনাস্থার স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজধানী বেলগ্রেডসহ নোভি সাদ ও নিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে ফল ঘোষণার পর উল্লাসে মেতে ওঠেন আন্দোলনের সমর্থকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, ‘সার্বিয়া স্বাধীন’। তাদের বিজয়ের প্রতীকী উদযাপনের অংশ হিসেবে সংসদ ভবনের সামনে ভুচিচ-সমর্থকদের তৈরি তাঁবু শিবির ‘চাচিল্যান্ড’ ভেঙে ফেলা হয়।
এই আন্দোলনের সূচনা ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। সেদিন সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। স্টেশনটির সংস্কারকাজে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সরকারি অবহেলা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।
প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সড়কে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুরু হলেও দ্রুত তা দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। কৃষক, শিল্পী, অভিনেতা, বিচারকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আন্দোলনের চাপে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। একই বছরের মার্চে বেলগ্রেডে নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর নেতৃত্বহীন সাংগঠনিক কাঠামো। শিক্ষার্থীরা প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো কোনো একক নেতার ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন। পরে এই আন্দোলনকে নির্বাচনী শক্তিতে রূপ দিতে তারা দেশজুড়ে সংগঠিত হন এবং ভোটারদের সমর্থন আদায়ে কাজ করেন।
নির্বাচনে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ২৫০টি সংসদীয় আসনেই প্রার্থী দেয়। তবে তালিকায় কোনো শিক্ষার্থী ছিলেন না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, চিকিৎসক, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর, অভিনেতা ও ক্রীড়াবিদদের মতো পরিচিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই তালিকার প্রায় ১৪০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
আন্দোলনের মূল লক্ষ্য দুর্নীতি দমন, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্যে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্র আন্দোলন।
তবে নির্বাচনে জয়ই আন্দোলনের শেষ লক্ষ্য নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শিক্ষার্থীরা নিজেরা নির্বাচনে অংশ নেননি; তাঁরা সাধারণ নাগরিকদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্যদের সামনে এনেছেন।
পরাজয় স্বীকার করলেও ভুচিচ দাবি করেছেন, নতুন শক্তি বেশিদিন টিকতে পারবে না। তার অভিযোগ, বিদেশি শক্তির সমর্থনে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। তবে আন্দোলনের নেতারা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সার্বিয়ার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যও জনঅসন্তোষ, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং সংগঠিত নাগরিক প্রতিরোধের মুখে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, রাজপথে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা, সংসদ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে।




