ভিনিউজ : ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের গৌরবময় ইতিহাস বুকে ধারণ করে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হলো ঢাকা। একুশের প্রথম প্রহর থেকেই রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নামে সর্বস্তরের মানুষের ঢল। রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রাত ১২টা ১ মিনিটে দিবসের সূচনায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শহীদ মিনারের বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিএনপি ও জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে ফুল দেওয়া হয়।
এরপর জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি-র আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১-দলীয় জোটের নেতারা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ জোটের সংসদ সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। উচ্চ আদালতের বিচারপতি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং তিন বাহিনীর প্রধানরাও পর্যায়ক্রমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনার চত্বর সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভোর হতেই দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেন বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্যরা। একে একে মানুষ ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অনেকেই খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নেন; কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে ব্যানার-ফেস্টুন।
শ্রদ্ধা জানাতে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ছায়ানট, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, টিআইবি, বাংলাদেশ স্কাউটস, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন-সহ বিভিন্ন সংগঠন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, এনডিএম, এবি পার্টি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি, বাসদ, জাসদ, জেএসডি প্রমুখ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা স্লোগান ও মিছিল নিয়ে উপস্থিত হন।
সংগঠনের বাইরে ব্যক্তিগতভাবেও অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে শহীদ মিনারে আসেন। শিশুদের হাত ধরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে দেখা যায় অভিভাবকদের। ইডেন মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ভাষা আন্দোলন শুধু ইতিহাসের অধ্যায় নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর শহীদ মিনারে এসে সেই চেতনাকে নতুন করে অনুভব করা যায়। ধানমন্ডি থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে আসা এক শিশু জানায়, “মায়ের ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের ফুল দিতে এসেছি।”
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সারি আরও দীর্ঘ হয়। পুরো এলাকা একুশের শোক, গর্ব ও সংহতির আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রভাতফেরির সুর, কবিতা আবৃত্তি ও দেশাত্মবোধক গানে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। বাংলাদেশে জেলা ও উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও সবাল থেকে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিত লক্ষ্য করা গিয়েছে । দেশের স্কুল ও কলেজের শহীদ গুলোও ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে । সারা দেশে সব প্রতিষ্ঠানে পতাকা অর্ধনমিত থাকছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে পালিত এই দিনটি ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী মর্যাদা পায়। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির চেতনায় নতুন করে জাগরণ ঘটায়। এ বছরও নতুর রাজনৈতিত প্রেক্ষাপটে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে-ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আজও জাতির প্রেরণার উৎস, আর মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি অঙ্গীকারবদ্ধ।




