রপ্তানির রাজনীতি, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ: চীনের উত্থান, ভারতের দৌড় এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

 

সম্পাদকীয় কলাম

জয়ন্ত আচার্য

ভিনিউজ : বিশ্ব অর্থনীতির শক্তির মানচিত্র এখন আর শুধু সামরিক ক্ষমতা বা প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একবিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের প্রকৃত শক্তির পরিচয় মিলছে তার শিল্প, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং রপ্তানি সক্ষমতায়। যে দেশ যত বেশি বিশ্ববাজারে পণ্য ও সেবা বিক্রি করতে পারছে, সেই দেশ তত বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করছে।

এই বাস্তবতায় আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক গল্পের নাম চীন। মাত্র চার দশক আগে কৃষিনির্ভর ও স্বল্প আয়ের একটি দেশ থেকে চীন আজ বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির পণ্য রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অঙ্ক শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আধুনিক শিল্পায়ন, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রপরিকল্পনা এবং উৎপাদনশীলতার এক অসাধারণ উদাহরণ।

বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, হংকং, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, মেক্সিকো, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ভারত এবং যুক্তরাজ্য। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই তালিকার অধিকাংশ দেশই প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য উৎপাদনে বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

চীনের সাফল্যের মূল রহস্য কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৭৮ সালে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরুর পর দেশটি ধাপে ধাপে রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি গ্রহণ করে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক সমুদ্রবন্দর, দ্রুতগতির রেলপথ, মহাসড়ক এবং দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলে তারা এমন একটি শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্বের প্রায় সব বড় কোম্পানি উৎপাদন করতে আগ্রহী হয়েছে।

আজ মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, শিল্পযন্ত্র, বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সৌর প্যানেল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোক্তা পণ্য-সব ক্ষেত্রেই চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। একসময় যাকে শুধু “সস্তা পণ্যের দেশ” বলা হতো, সেই চীন এখন উচ্চপ্রযুক্তি রপ্তানিতেও বিশ্বনেতা।

তবে বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প হলো ভারতের উত্থান।
ভারতের পণ্য রপ্তানি ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সেবা রপ্তানি-বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, পরামর্শসেবা ও ব্যবসায়িক সেবাসহ-যোগ করলে ভারতের বৈদেশিক আয়ের পরিধি আরও বড়। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ, রাসায়নিক, প্রকৌশল পণ্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম উৎপাদনে ভারত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের উৎপাদনের একটি অংশ চীন থেকে ভারতে সরিয়ে নিচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য আনার কৌশল, ভূরাজনৈতিক বিবেচনা এবং নতুন বাজারের সন্ধান। ফলে আগামী দশকে ভারত যে আরও বড় রপ্তানিকারক হবে, সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে একটি বিষয়ও স্পষ্ট-ভারত এগোলেও চীনের সঙ্গে ব্যবধান এখনও অনেক বড়। উৎপাদন সক্ষমতা, অবকাঠামো, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং শিল্পায়নের গভীরতায় চীন এখনও বহু দূর এগিয়ে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে চিত্রটি ভিন্ন। বাংলাদেশ পোশাকশিল্পে বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। তৈরি পোশাক দেশের রপ্তানির প্রধান চালিকা শক্তি। পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক পণ্যে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু রপ্তানি এখনও সীমিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরশীল। পণ্যের বৈচিত্র্য, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত বন্দর এবং দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে।

পাকিস্তান এখনও মূলত টেক্সটাইল ও কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তাদের রপ্তানিকে সীমাবদ্ধ করছে। শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে আবার চা, পোশাক ও রাবারপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের অর্থনীতি আকারে ছোট; ফলে বৈশ্বিক রপ্তানিতে তাদের অবদানও সীমিত।

বিশ্ব এখন নতুন এক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সবুজ জ্বালানি, উন্নত ব্যাটারি, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল সেবাই আগামী দশকের রপ্তানি বাজার নির্ধারণ করবে। যে দেশ এই প্রযুক্তিগুলো আয়ত্ত করবে, তারাই বৈশ্বিক অর্থনীতির নেতৃত্ব দেবে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। শুধু শ্রমনির্ভর শিল্পের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ইলেকট্রনিক্স, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর আধুনিকীকরণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ, গবেষণা-উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

রপ্তানির লড়াই শুধু অর্থনীতির লড়াই নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বেরও লড়াই। চীন সেই লড়াইয়ে বহু আগেই এগিয়ে গেছে। ভারত দ্রুত গতি বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন হলো-দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, এই পরিবর্তিত বিশ্বে নিজেদের কোথায় দেখতে চায়?

আজ যে দেশ বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেবে, আগামীকাল সেই দেশই অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং কূটনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। আর যে দেশ পিছিয়ে পড়বে, তাকে অন্যের উৎপাদিত পণ্যের বাজার হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

পূর্বের খবরপ্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ধানমণ্ডি-গুলশান লেক সংস্কারবিষয়ক বৈঠক
পরবর্তি খবরকখনো হারেনি : বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার অনন্য আত্মবিশ্বাসের মঞ্চ
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!