বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে আধুনিক ফুটবলে শুধু তারকা খেলোয়াড় বা বিশ্ব র্যাঙ্কিং নয়, সঠিক কৌশল, শৃঙ্খলা ও দলগত পরিকল্পনাও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। এবারের ৪৮ দলের বিশ্বকাপে তুলনামূলক দুর্বল হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি দল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দারুণ লড়াই করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কেপ ভার্দে স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে, ঘানা একই ফল করেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, কুরাসাও পয়েন্ট ছিনিয়ে নিয়েছে ইকুয়েডরের কাছ থেকে, আর দক্ষিণ আফ্রিকা চমকে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াকে। প্রশ্ন উঠছে-এগুলো কি শুধুই ভাগ্যের জোর, নাকি এর পেছনে রয়েছে সুচিন্তিত কৌশলগত পরিকল্পনা?
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব দলের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা। স্পেনের মতো বল দখলে দক্ষ দলের বিপক্ষে কেপ ভার্দে ৪-৫-১ ছকে এমন একটি সঙ্কুচিত রক্ষণ তৈরি করেছিল, যেখানে মাঝমাঠ ও ডিফেন্ডারদের মধ্যে প্রায় কোনো ফাঁকই ছিল না। স্পেন বারবার বল পেছনে পাঠিয়ে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের ওপরে তুলে আনতে চাইলেও তারা সেই ফাঁদে পা দেয়নি। বরং নিজেদের অবস্থান অটুট রেখে প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠে জায়গা তৈরি করার সুযোগ দেয়নি। ফলে স্পেনকে বাধ্য হয়ে দুই প্রান্ত কিংবা লম্বা পাসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যা খুব একটা কার্যকর হয়নি।
একই কৌশল দেখা গেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার খেলায়ও। ইংল্যান্ডের নতুন কৌশলের অন্যতম অংশ হলো নিজেদের অর্ধে নেমে এসে প্রতিপক্ষকে প্রেসিংয়ে টেনে এনে হঠাৎ দ্রুত আক্রমণে যাওয়া। কিন্তু ঘানা সেই পরিকল্পনা আগে থেকেই বুঝে নিয়েছিল। তারা রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠকে অত্যন্ত কাছাকাছি রেখে ইংল্যান্ডের জন্য বিপজ্জনক জায়গাগুলো বন্ধ করে দেয়। শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়কে সামনে রেখে বাকিরা ধৈর্যের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন। এতে ইংল্যান্ডের বলের দখল থাকলেও কার্যকর আক্রমণ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যানও এই কৌশলের সফলতা তুলে ধরে। ফুটবলে প্রেসিংয়ের মাত্রা বোঝাতে ব্যবহৃত ‘পিপিডিএ’ (PPDA) সূচকে কেপ ভার্দে ও ঘানার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রতিপক্ষকে বল নিয়ে খেলতে দিয়েছে, কিন্তু নিজেদের রক্ষণভাগের গঠন ভাঙেনি। ম্যাচের শেষ দিকে অবশ্য দুই দলই কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়েছে, কারণ তখন তারা জয় ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল।
তবে সব ছোট দল যে সফল হয়েছে, তা নয়। যেসব দল শুধু রক্ষণে মনোযোগ দিয়ে পুরো দলকে বলের দিকে টেনে এনেছে, তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। স্পেনের বিপক্ষে সৌদি আরবের ৪-০ গোলে হারের অন্যতম কারণ ছিল তাদের অতিরিক্ত সংকীর্ণ রক্ষণ। বল যেদিকে গেছে, পুরো দল সেদিকেই সরে এসেছে। ফলে মাঠের অন্য প্রান্তে বিশাল জায়গা ফাঁকা হয়ে গেছে। স্পেন দ্রুত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বল ঘুরিয়ে এই দুর্বলতার পুরো সুবিধা নেয়। ডান দিক দিয়ে লামিন ইয়ামাল ও পেদ্রো পোরো বারবার দুই বনাম এক পরিস্থিতি তৈরি করেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্পেনের একটি গোল আসে সহজ ক্রস থেকে।
একই ভুল করেছে সুইডেনও। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৫-১ গোলে হারের ম্যাচে তাদের ৫-৩-২ ছক মাঝমাঠের প্রস্থ ঠিকভাবে সামাল দিতে পারেনি। তিনজন মিডফিল্ডার পুরো মাঠ ঢাকতে ব্যর্থ হন। ডান প্রান্ত দিয়ে ডেনজেল ডামফ্রিসের ওভারল্যাপিং দৌড় বারবার সুইডেনের রক্ষণকে বিপদে ফেলে। পরে তারা ৪-৫-১ ছকে ফিরলেও ততক্ষণে ম্যাচ অনেকটাই হাতছাড়া হয়ে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছোট দলগুলোর সাহসী আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা। অতীতে দুর্বল দলগুলো সাধারণত গোলকিপারের কাছ থেকে লম্বা বল খেলেই আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করত। কিন্তু এবার দেখা গেছে, কেপ ভার্দে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইরাকের মতো দলগুলো নিজেদের গোলরক্ষকের কাছ থেকে ছোট পাসে খেলা শুরু করছে। তারা মাঠজুড়ে খেলোয়াড়দের দূরে দূরে অবস্থান করিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রেসিংয়ে টেনে আনছে। এরপর সুযোগ বুঝে লম্বা বা উঁচু পাসে দ্রুত আক্রমণে উঠে যাচ্ছে। এতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ মুহূর্তের মধ্যেই অগোছালো হয়ে পড়ছে।
অবশ্য এই কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইরাক এমনভাবে বল বের করতে গিয়ে কয়েকটি গোলও হজম করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বেশ কিছু ভালো আক্রমণও তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি এসেছে ঠিক এমনই একটি দ্রুত আক্রমণ থেকে। প্রতিপক্ষের অধিকাংশ খেলোয়াড় ওপরে উঠে আসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা কয়েকটি নিখুঁত পাসে পুরো মাঠ পেরিয়ে গোল আদায় করে নেয়।
সবশেষে, কৌশল যত ভালোই হোক, সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও। কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলের জন্য মূল্যবান এক পয়েন্ট নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম এক ম্যাচে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। তাদের অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রমাণ করে, সঠিক সময়ে একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ নৈপুণ্য পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে।
এবারের বিশ্বকাপ তাই নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আধুনিক ফুটবলে র্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্য আগের মতো আর বড় বিষয় নয়। সঠিক পরিকল্পনা, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমণ এবং আত্মবিশ্বাসী মানসিকতা থাকলে ছোট দলও বিশ্বসেরাদের বিপক্ষে সমানতালে লড়াই করতে পারে। আর সেই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু তারকাদের নয়, বরং কৌশল, সাহস এবং দলগত ফুটবলেরও এক উজ্জ্বল প্রদর্শনী হয়ে উঠেছে।




