বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ ডেস্ক : ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ক্রমেই পরিণত হচ্ছে আক্রমণভাগের তারকাদের এক অভূতপূর্ব মঞ্চে। প্রতিটি ম্যাচেই দেখা যাচ্ছে গোলের ঝড়, আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছেন তিন মহাতারকা-আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে এবং নরওয়ের এরলিং হলান্ড। মাত্র দুটি করে ম্যাচ শেষে এই তিনজনের সম্মিলিত গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩। ফলে সেরা গোলদাতার পুরস্কার ঘিরে শুরু হয়েছে এক রোমাঞ্চকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এ মুহূর্তে সবার ওপরে রয়েছেন মেসি। দুই ম্যাচে তিনি করেছেন পাঁচ গোল। তার ঠিক পেছনেই আছেন এমবাপে ও হলান্ড, দুজনেরই ঝুলিতে চারটি করে গোল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা ঘটল, যেখানে প্রথম দুই ম্যাচ শেষে তিনজন খেলোয়াড় চার বা তার বেশি গোল করেছেন। এর আগে এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে নতুন ইতিহাস গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তিনি এখন এককভাবে শীর্ষে। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮, যা এসেছে ২৮টি ম্যাচে। চলতি আসরে আর্জেন্টিনার করা পাঁচটি গোলের সবকটিই এসেছে তার পা থেকে।
তবে মেসিকে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছেন না এমবাপে। ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে উন্নীত করেছেন। মাত্র ১৬ ম্যাচেই এই কীর্তি গড়ে তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। ফরাসি এই তারকা এখন শুধু সেরা গোলদাতার পুরস্কার নয়, বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের দিকেও নজর রাখছেন।
অন্যদিকে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম অংশগ্রহণেই আলো ছড়াচ্ছেন হলান্ড। সেনেগালের বিপক্ষে দুটি গোল করে তিনি নরওয়েকে শেষ বত্রিশে তুলেছেন। প্রথম দুই ম্যাচেই জোড়া গোল করার বিরল কীর্তি গড়েছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ৫২ ম্যাচে ৫৯, যা তার অসাধারণ ধারাবাহিকতার প্রমাণ।
বিশ্ব ফুটবলের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে এই তিন তারকার মধ্যে তুলনা করা কঠিন। মেসির সৃজনশীলতা ও খেলার সৌন্দর্য, এমবাপের গতি ও আক্রমণাত্মক দক্ষতা, আর হলান্ডের নিখুঁত গোল করার ক্ষমতা-সব মিলিয়ে তারা তিনজনই আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোল করার ক্ষেত্রে হলান্ডের মতো স্বাভাবিক প্রতিভা খুব কমই দেখা যায়। অন্যদিকে মেসি এখনও তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করছেন। আর এমবাপে প্রমাণ করে চলেছেন যে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড় তিনি।
চলতি বিশ্বকাপে শুধু এই তিনজনই নন, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনও রয়েছেন আলোচনায়। প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করা কেইন যদি নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে সেরা গোলদাতার লড়াই আরও জমে উঠবে।
বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বাড়ার পেছনেও রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে শক্তিশালী দলগুলোর আক্রমণভাগ বেশি সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি শিরোপা জিততে এখন আগের চেয়ে একটি অতিরিক্ত নকআউট ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। এতে গোলসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগও বেড়েছে।
বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বাধিক ১৩ গোল করার রেকর্ড এখনও ফ্রান্সের জুস্ত ফন্তেইনের দখলে। ১৯৫৮ সালে গড়া সেই রেকর্ড আজও অটুট। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, মেসি, এমবাপে কিংবা হলান্ডের কেউ একজন হয়তো সেই রেকর্ডকে হুমকির মুখে ফেলতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন মজার ছলে বলেছেন, মেসি, এমবাপে ও হলান্ডকে থামানো প্রায় অসম্ভব। তারা যেন প্রতিটি ম্যাচেই গোল করবেন—এটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তার ভাষায়, “তারা এতটাই অবধারিত যে মনে হয় গোল করা তাদের দৈনন্দিন কাজ।”
বিশ্বকাপ এখনও অনেক বাকি। সামনে রয়েছে নকআউট পর্বের উত্তেজনা। তবে এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে বলা যায় ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু দলগত লড়াই নয়, বরং মেসি, এমবাপে ও হলান্ডের অসাধারণ গোলযুদ্ধের জন্যও দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন সেরা গোলদাতার মুকুট, সেটিই এখন ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় কৌতূহল।




