প্রাচীন হজপথ : যেভাবে দূর-দূরান্তের মুসলমানরা মক্কায় সমবেত হতেন

প্রাচীন হজপথ : যেভাবে দূর-দূরান্তের মুসলমানরা মক্কায় সমবেত হতেন

ওমাইমা আল-শাজলি
বিবিসি অ্যারাবিক

ভিনিউজ : একসময় হজ পালন শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদত ছিল না, বরং ছিল জ্ঞান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও সভ্যতার এক মহাসম্মিলন। চীন, ভারত, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলমানরা মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর ভ্রমণ করে মক্কায় পৌঁছাতেন। মরুভূমি, পাহাড়, সমুদ্র ও বিপজ্জনক জনপদ অতিক্রম করে গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের বিখ্যাত সব হজপথ, যা ইসলামী সভ্যতার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ ড. আতেফ মোয়াতামেদের মতে, আধুনিক বিশ্বায়নের বহু আগে হজ মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিনিময়ের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। এসব পথে চলতে চলতে হাজিরা শুধু ইবাদতই করতেন না, বরং আলেম, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের সঙ্গে পরিচিত হতেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত হতেন।

প্রাচীন হজপথগুলোর পাশে গড়ে উঠেছিল মসজিদ, কূপ, দুর্গ, বিশ্রামাগার ও পানির ট্যাংক। এসব স্থাপনা শুধু যাত্রীদের সহায়তা করেনি, বরং ইসলামী সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। হাজিদের যাত্রাপথে “মানাজিল” নামে পরিচিত বিরতি কেন্দ্র ছিল, যেখানে কাফেলাগুলো বিশ্রাম নিত এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ তৈরি হতো।

মক্কার কাছে পৌঁছানোর আগে হাজিদের পাঁচটি নির্দিষ্ট মীকাত অতিক্রম করতে হতো। এখান থেকেই তারা ইহরাম পরিধান ও হজের নিয়ত করতেন। মদিনার হাজিদের জন্য ছিল যুলহুলাইফা, ইরাকের জন্য জাতু ইরক, নজদের জন্য কারনুল মানাজিল, মিসর ও শামের জন্য আল-জুহফা এবং ইয়েমেনের জন্য ইয়ালামলাম।

সবচেয়ে বিখ্যাত হজপথগুলোর একটি ছিল “দারব জুবাইদা” বা জুবাইদা পথ। এটি ইরাকের কুফা থেকে মক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদের স্ত্রী জুবাইদা এই পথের উন্নয়ন ও পানির ব্যবস্থা করেছিলেন বলে পথটি তার নামেই পরিচিত হয়। প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে অসংখ্য কূপ, জলাধার ও বিশ্রামকেন্দ্র নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাখো হাজি এই পথ ব্যবহার করেছেন। আজ যে দূরত্ব বিমানে এক ঘণ্টায় অতিক্রম করা যায়, একসময় তা উটের কাফেলায় পাড়ি দিতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগত।

ইরাকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল “আল-দারব আল-বাসরি” বা বসরা পথ। দক্ষিণ ইরাকের বসরা থেকে শুরু হওয়া এই পথ মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চল থেকে আগত হাজিদের জন্য ব্যবহৃত হতো। উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের মুসলমানরা তুর্কমেনিস্তান ও ইরানের খোরাসান হয়ে ইরাকে প্রবেশ করতেন। তারা বাগদাদে জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার আসরে অংশ নিয়ে পরে মক্কার পথে যাত্রা করতেন।

শামি বা সিরীয় হজপথও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দামেস্ক থেকে জর্ডানের মাআন ও তাবুক হয়ে মদিনায় পৌঁছাত। আরেকটি শাখা গাজা ও আকাবা হয়ে মিশরের হজপথের সঙ্গে মিলিত হতো। ক্রুসেড যুদ্ধের সময় এই পথের অনেক অংশ বিপজ্জনক হয়ে পড়লে হাজিদের রুট পরিবর্তন করতে হয়েছিল। পরে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের উদ্যোগে হিজাজ রেলপথ নির্মিত হলে শামি হজযাত্রায় বিপ্লব ঘটে। ১৯০৮ সালে দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হলে এক মাসের যাত্রা নেমে আসে মাত্র চার দিনে। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রেলপথ ধ্বংস হয়ে যায়।

মিশরীয় হজপথ ছিল আফ্রিকা ও উত্তর আফ্রিকার মুসলমানদের প্রধান রুট। কায়রো থেকে শুরু হওয়া এই পথ সিনাই উপদ্বীপ পেরিয়ে আকাবা ও মদিনা হয়ে মক্কায় পৌঁছাত। মরক্কো, আন্দালুস, সুদান ও পশ্চিম আফ্রিকার হাজিরা এই কাফেলায় যোগ দিতেন। কোনো কোনো সময় ইউরোপ ও রাশিয়ার মুসলমানরাও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে কায়রোয় এসে এই কাফেলার অংশ হতেন।

মিশরীয় হজপথের একটি অংশ ছিল সমুদ্রভিত্তিক। হাজিরা নীল নদ হয়ে দক্ষিণ মিশরের আইদাব বন্দরে পৌঁছে ছোট নৌকায় জেদ্দার দিকে যাত্রা করতেন। ক্রুসেড যুদ্ধের সময় নিরাপত্তার কারণে স্থলপথ এড়িয়ে এই সমুদ্রপথ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে আবার স্থলপথে প্রত্যাবর্তন ঘটে। উনিশ শতকে কায়রো থেকে সুয়েজ পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হলে যাত্রা আরও সহজ হয়।

আফ্রিকার মুসলমানদের জন্যও ছিল দীর্ঘ ও কষ্টকর হজপথ। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা থেকে হাজিরা সুদান হয়ে লোহিত সাগরের উপকূলীয় বন্দর সুয়াকিনে পৌঁছাতেন। সেখান থেকে সমুদ্রপথে জেদ্দায় যেতেন। প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রায় কখনও এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেত। আফ্রিকার শিং অঞ্চল, সোমালিয়া ও জাঞ্জিবার থেকেও সমুদ্রপথে হাজিরা আরব উপদ্বীপে আসতেন।

ইয়েমেনি হজপথও প্রাচীন বাণিজ্যপথের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছিল। সানা থেকে শুরু হওয়া এই পথ আসির পর্বতমালা, বিশা ও তাবালা হয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হতো। অনেক হাজি ইয়ালামলাম মীকাত হয়ে লোহিত সাগরের উপকূলীয় পথ ব্যবহার করতেন।

ওমানি হজপথ দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি পথ মরুভূমি পেরিয়ে নজদ অঞ্চলের দিকে যেত, অন্যটি ইয়েমেন হয়ে হিজাজের পথে যুক্ত হতো। একইভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের হাজিদের জন্য ছিল আল-আহসা পথ, যা কাতিফ ও কাতার অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে নজদ হয়ে মক্কায় পৌঁছাত।

এসব হজপথ শুধু ধর্মীয় যাত্রার রুট ছিল না; বরং ছিল মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রবাহমান ধমনী। বিভিন্ন অঞ্চলের আলেমরা পথে পথে হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও সাহিত্যচর্চা করতেন। হাজিরা মক্কা ও মদিনায় গিয়ে শুধু ইবাদত করতেন না, বরং নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজ দেশে ফিরতেন।

বর্তমানে বিমানযাত্রা হজকে সহজ ও দ্রুত করেছে। কায়রো থেকে জেদ্দায় পৌঁছাতে এখন যেখানে দুই ঘণ্টা লাগে, অতীতে সেই পথ পাড়ি দিতে চল্লিশ দিনের বেশি সময় লাগত। তবে গবেষকদের মতে, আধুনিকতার এই সুবিধা হজযাত্রার অনেক আত্মিক ও মানবিক অভিজ্ঞতাকেও কমিয়ে দিয়েছে। একসময় যে যাত্রা ছিল ধৈর্য, ত্যাগ ও আত্মিক সাধনার প্রতীক, আজ তা অনেকটাই প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুতগতির ভ্রমণে পরিণত হয়েছে।

তবুও ইতিহাসের এসব প্রাচীন হজপথ মুসলিম সভ্যতার ঐক্য, জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সংযোগের এক অসাধারণ স্মারক হয়ে আজও মানুষের কল্পনায় বেঁচে আছে।

-সম্পাদীত

পূর্বের খবরঢাকায় ভূমিকম্প অনুভূত
পরবর্তি খবরসাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা : ইউনূস সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিত ‘কিচেন কেবিনেট’