বিশেষ প্রতিবেদন
আদিত্য আচার্য রুদ্র
ভিনিউজ : পৃথিবীতে এখন একটি দিন মানেই প্রায় ২৪ ঘণ্টা। নিজের অক্ষের চারপাশে একবার ঘুরতে পৃথিবীর যে সময় লাগে, তার ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে দিন-রাতের হিসাব। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকেই কি দিনের দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা ছিল? বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, মোটেই নয়। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য ছিল অনেক কম। সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমেছে এবং দীর্ঘ হয়েছে দিনের পরিধি। এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের।
প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে চাঁদের সৃষ্টি হওয়ার পর পৃথিবীর ওপর তার মহাকর্ষীয় প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর একেবারে প্রাচীন সময়ে একটি দিন ১০ ঘণ্টারও কম ছিল। কিন্তু চাঁদের টানে পৃথিবীর মহাসাগরে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয়। এই জোয়ার পৃথিবীর ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে এক ধরনের স্ফীতি তৈরি করে। সমুদ্রের পানি ও সমুদ্রতলের মধ্যে ঘর্ষণের ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অর্থাৎ চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর ঘূর্ণনের ওপর অনেকটা ব্রেকের মতো কাজ করছে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতি ১০০ বছরে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৭ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। সময়ের হিসাবে এই পরিবর্তন অত্যন্ত সামান্য। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর কোনও তাৎক্ষণিক প্রভাবও বোঝা যায় না। কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে এই ক্ষুদ্র পরিবর্তন জমা হলে তার প্রভাব হয়ে ওঠে বিশাল।
তবে চাঁদ একাই যদি পৃথিবীর ঘূর্ণন কমিয়ে যেত, তা হলে আজকের দিনে পৃথিবীর একটি দিন ৬০ ঘণ্টারও বেশি হতে পারত। নতুন গবেষণা বলছে, এমনটা হয়নি সূর্যের প্রভাবের কারণে। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল জ্যোতি র্পদার্থ বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন, পৃথিবীর ঘূর্ণনের ক্ষেত্রে চাঁদের পাশাপাশি সূর্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর থিয়োরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিজ্ঞানী নরম্যান মারে।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায়, চাঁদের প্রভাবে যেমন সমুদ্রের জলে জোয়ারের সৃষ্টি হয়, তেমনই সূর্যের মহাকর্ষের প্রভাবেও পৃথিবীতে জোয়ার-সংক্রান্ত পরিবর্তন ঘটে। তবে সূর্যের প্রভাব মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সূর্যের মহাকর্ষ বায়ুমণ্ডলকে আকর্ষণ করে এবং সেখানে এক ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় স্ফীতি তৈরি হয়। এই স্ফীতির প্রভাব পৃথিবীর ঘূর্ণনের ওপর পড়ে এবং তা ঘূর্ণনকে কিছুটা দ্রুত করার দিকে কাজ করে।
এই কারণে বিজ্ঞানীরা চাঁদের প্রভাবকে ‘ব্রেক’ এবং সূর্যের প্রভাবকে অনেকটা ‘অ্যাক্সিলারেটর’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর করে, আর সূর্যের প্রভাব সেই ধীরগতিকে কিছুটা ঠেকিয়ে রাখে। ফলে দিনের দৈর্ঘ্য যে হারে বাড়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা তার চেয়ে অনেক ধীরে বাড়ছে।
তবে চাঁদ ও সূর্যের এই মহাকর্ষীয় টানাপোড়েনে ভারসাম্য নেই। পৃথিবীর অনেক কাছে থাকার কারণে চাঁদের জোয়ার সৃষ্টির ক্ষমতা সূর্যের তুলনায় অনেক বেশি। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, সূর্যের জোয়ার-সংক্রান্ত প্রভাব চাঁদের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ দুর্বল। তাই সূর্য পৃথিবীর ঘূর্ণনকে কিছুটা ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করলেও চাঁদের প্রভাবকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীরে ধীরে কমতেই থাকে এবং দিনের দৈর্ঘ্যও বাড়তে থাকে।
এই গবেষণা পৃথিবীর দিন-রাতের পরিচিত ২৪ ঘণ্টার হিসাবের পেছনে থাকা দীর্ঘ মহাজাগতিক ইতিহাসকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। অর্থাৎ পৃথিবীর একটি দিনের দৈর্ঘ্য কেবল পৃথিবীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চাঁদ, সূর্য, মহাসাগর এবং বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় সম্পর্ক। কোটি কোটি বছর ধরে চলা এই মহাজাগতিক টানাপোড়েনই ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য। ভবিষ্যতেও এই পরিবর্তন চলবে, যদিও মানুষের জীবদ্দশায় তার প্রভাব প্রায় অনুভবই করা যাবে না।




