আদিত্য আচার্য রুদ্র
বিশেষ প্রতিবেদন
বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজত্বের নাম স্পেন। এক সময় যে দলকে শুধু সুন্দর পাসিং ফুটবলের জন্য প্রশংসা করা হতো, এখন সেই দলই ধারাবাহিক সাফল্য, শিরোপা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে অদম্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তাদের আধিপত্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মাত্র দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এবার বিশ্বকাপ জয়—এ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। এবারও একই ছন্দে তারা ইউরোপের সিংহাসন থেকে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে উঠে এসেছে।

তবে স্পেনের সাফল্যের গল্প কেবল পুরুষ দলের নয়। নারী ফুটবলেও তারা সমানভাবে সফল। ২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগ জিতেছে স্পেনের নারী দল। ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সময়ে পুরুষ ও নারী—উভয় বিভাগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা ধরে রেখেছে দেশটি।
শুধু সিনিয়র পর্যায় নয়, বয়সভিত্তিক ফুটবলেও স্পেনের আধিপত্য বিস্ময়কর। গত পাঁচ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত বিশ্ব ও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তারা জিতেছে ১৬টি বড় শিরোপা। এই অর্জন প্রমাণ করে যে স্পেনের সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ফুটবল কাঠামোর ফল।
এই উত্থানের অন্যতম স্থপতি জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় অনেকেই তার নিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছিলেন। কারণ বড় কোনো ক্লাব পরিচালনার অভিজ্ঞতা তার ছিল না। কিন্তু স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করায় তিনি খেলোয়াড়দের মানসিকতা, খেলার দর্শন এবং দলীয় সংস্কৃতি খুব ভালোভাবে জানতেন। সেই অভিজ্ঞতাই আজ বিশ্বজয়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন ইতোমধ্যে নেশনস লিগ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বিশ্বকাপ জিতেছে। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু ট্রফি নয়, বরং এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড়ের লক্ষ্য পরবর্তী ম্যাচ জেতা। আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা নেই, বরং ধারাবাহিক উন্নতিই তাদের মূল দর্শন।

স্পেনের ফুটবল বিপ্লবের আরেকটি বড় শক্তি তাদের একাডেমি ব্যবস্থা। লা মাসিয়া কিংবা দেশের অন্যান্য ফুটবল একাডেমিতে ছোটবেলা থেকেই একই ধরনের কৌশল, পাসিং ফুটবল, বল নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় শৃঙ্খলার শিক্ষা দেওয়া হয়। ফলে বয়সভিত্তিক দল থেকে সিনিয়র দলে উঠে আসার সময় খেলোয়াড়দের মানিয়ে নিতে খুব বেশি সময় লাগে না।
এই পরিকল্পনার সুফল এখন মাঠে দেখা যাচ্ছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিনে ইয়ামাল বিশ্বকাপ জয় করেছেন। একইভাবে পাউ কুবারসিও কিশোর বয়সেই বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরুর একাদশে খেলেছেন। অন্যদিকে নারী ফুটবলে ভিকি লোপেজ ও সালমা পারাইয়ুয়েলোর মতো তরুণ তারকারা ইতোমধ্যেই ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়দের কাতারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নতুন প্রজন্মের এই প্রতিভারাই স্পেনের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
নারী ফুটবলে স্পেনের পরিবর্তনও অনুকরণীয়। এক দশক আগেও মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত একাডেমি, প্রশিক্ষণ সুবিধা কিংবা আর্থিক সহায়তা ছিল না। কিন্তু গত কয়েক বছরে অবকাঠামো উন্নয়ন, বয়সভিত্তিক দল গঠন এবং পেশাদার পরিবেশ তৈরির ফলে নারী ফুটবলেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এর ফল হিসেবে বিশ্বকাপ ও নেশনস লিগের শিরোপা এখন স্পেনের ট্রফি কেবিনেটে।
বর্তমানে স্পেন সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত। পুরো ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষরা তাদের গোলবার লক্ষ্য করে খুবই কম কার্যকর আক্রমণ করতে পেরেছে। শক্তিশালী রক্ষণ, সৃজনশীল মিডফিল্ড এবং ধারালো আক্রমণের সমন্বয়ে স্পেন এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলেছে, যার সমকক্ষ এখন খুব কম।
বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তিরাও স্পেনের এই সাফল্যের প্রশংসা করছেন। তাদের মতে, এটি কেবল প্রতিভাবান কয়েকজন খেলোয়াড়ের গল্প নয়; বরং একটি সুসংগঠিত ফুটবল দর্শন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী যুব উন্নয়ন ব্যবস্থার সাফল্য। শিরোপা জয়ের অভ্যাস এখন স্পেনের ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্পেনের আধিপত্যের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ কোচিং, শক্তিশালী একাডেমি, নারী ও পুরুষ ফুটবলে সমান বিনিয়োগ এবং প্রতিভা বিকাশের ধারাবাহিকতা। বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যতের তারকারাও ইতোমধ্যে প্রস্তুত। তাই বিশ্ব ফুটবলের নতুন শক্তিধর হিসেবে স্পেনের এই রাজত্ব আরও বহু বছর স্থায়ী হতে পারে বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।




