ভিনিউজ ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে ফিফার কথিত বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার নিয়ে নতুন পরিকল্পনা। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবকে ঘিরে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার ভেতরে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন দুই নারী প্রশাসক—লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার ও লিসে ক্লেভনেস। তাঁদের নেতৃত্ব এবং স্পষ্ট অবস্থানই শেষ পর্যন্ত উয়েফার আপত্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে বলে ইউরোপীয় ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
প্রাথমিকভাবে ফিফার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উয়েফা। সংস্থাটির আশঙ্কা ছিল, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ফুটবলের ঐতিহ্য, প্রতিযোগিতার ভারসাম্য এবং সদস্য দেশগুলোর স্বার্থে প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি নিয়ে উয়েফার অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ হিসেবে সামনে আসেন সংস্থাটির সহ-সভাপতি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার। তিনি প্রয়োজনে ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কটের মতো কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনার কথাও উত্থাপন করেন। তাঁর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এবং উয়েফা নির্বাহী কমিটির সদস্য লিসে ক্লেভনেস।
পরবর্তীতে উয়েফার সঙ্গে এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল প্রশাসনেরও সমর্থন যুক্ত হওয়ায় ফিফার ওপর চাপ আরও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ থেকে সরে আসে ফিফা, যা ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার ও লিসে ক্লেভনেস শুধু প্রশাসক নন, দুজনই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাবেক ফুটবলার। লরা ওয়েলস জাতীয় দলের হয়ে এবং লিসে নরওয়ে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। মাঠের অভিজ্ঞতা তাঁদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ফুটবল বিশ্লেষকদের মত।
নারী ফুটবলের বিকাশেও লরার অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৯২ সালে তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ফলে ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে নারী ফুটবল দলকে স্বীকৃতি দেয়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে তিনি ক্রীড়া প্রশাসন নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
অন্যদিকে, লিসে ক্লেভনেস খেলোয়াড় হিসেবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অংশ নিয়েছেন। পরবর্তীতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে তিনি ক্রীড়া প্রশাসনে যুক্ত হন। ২০২২ সালে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের ১২০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েন। তাঁর নেতৃত্বে স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং সুশাসনের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
নারী নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এই দুই প্রশাসকের ভূমিকা প্রশংসিত। ২০২৩ সালে লরা ম্যাকঅ্যালিস্টারের উদ্যোগেই উয়েফার নির্বাহী কমিটিতে লিসে ক্লেভনেসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে দুজনই ইউরোপীয় ফুটবলের নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
মানবাধিকার ও ফুটবলের মূল্যবোধের প্রশ্নেও তাঁদের অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট। কাতার বিশ্বকাপে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। একইভাবে সৌদি আরবকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তাঁরা সমালোচনামুখর ছিলেন। তাঁদের মতে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রতীক।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনে নারী নেতৃত্বের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে এবং লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার ও লিসে ক্লেভনেস সেই পরিবর্তনের অন্যতম মুখ। সাম্প্রতিক ঘটনায় তাঁদের দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করেছে যে আধুনিক ফুটবল প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, নৈতিক অবস্থান এবং নেতৃত্ব—এই তিনটি গুণই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ার ঘটনাও সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




