ভিনিউজ ডেস্ক
তিন বছরেরও বেশি সময় কোমায় থাকার পর থাইল্যান্ডের রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভা ৪৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার মৃত্যু শুধু থাই রাজপরিবারেই নয়, দেশটির ভবিষ্যৎ রাজকীয় উত্তরাধিকার নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেননি। তবে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভাকে দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে রাজধানী ব্যাংককের বাইরে পাক চং এলাকায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। পরে রাজপ্রাসাদ জানায়, মাইকোপ্লাজমা সংক্রমণজনিত জটিলতা থেকে সৃষ্ট হৃদস্পন্দনের অনিয়মের কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় চলে যান। দীর্ঘ চিকিৎসার পর গত ১১ জুন ব্যাংককের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভা ছিলেন রাজা ভাজিরালংকর্ন এবং তার প্রথম স্ত্রী সোমসাওয়ালি-এর জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ব্যাংককে জন্ম নেওয়া এই রাজকন্যা আধুনিক ও শিক্ষিত রাজপরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তিনি যুক্তরাজ্যের হিথফিল্ড স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর থাইল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। কয়েক দশকের মধ্যে বিদেশে শিক্ষা গ্রহণকারী প্রথম থাই রাজকন্যা হিসেবেও তিনি পরিচিতি পান।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের কারণে তিনি “আইনজীবী রাজকন্যা” নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া ও স্লোভাকিয়ায় থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘের অপরাধ প্রতিরোধ ও ফৌজদারি বিচার বিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশেষ করে নারী বন্দিদের অধিকার, গর্ভবতী কারাবন্দিদের সুরক্ষা এবং মুক্তির পর তাদের পুনর্বাসন নিয়ে তার কাজ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়।
২০২১ সালে তার কর্মজীবনে নতুন মাত্রা যোগ হয়, যখন তাকে রাজার অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনী ‘কিংস গার্ড’-এর চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেনারেল পদমর্যাদায় এই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি সামরিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রেই নিজের প্রভাব বিস্তার করেন।
রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ঐতিহ্যবাহী থাই পোশাকে দেখা গেলেও সামরিক দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ইউনিফর্মে উপস্থিত হতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা ও কর্মমুখী। কোভিড মহামারির সময় তিনি নিজের দীর্ঘ চুল ছোট করে ফেলেছিলেন, যা সে সময় থাইল্যান্ডে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি ছিলেন মেধাবী, পরিশ্রমী এবং আত্মবিশ্বাসী একজন রাজকন্যা, যিনি রাজপরিবারের প্রচলিত অনেক অলিখিত নিয়ম ভেঙে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তার জনপ্রিয়তাও ক্রমাগত বাড়ছিল।
রাজকুমারীর মৃত্যুর পর এখন নজর পড়েছে দীপাঙ্কর্ন রাসমিজোতি-এর দিকে। তিনি রাজা ভাজিরালংকর্নের একমাত্র পুত্র, যিনি এখনো রাজপরিবারের উত্তরাধিকার প্রশ্নে সবচেয়ে আলোচিত নাম। তবে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তার নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ফলে বজরাকিতিয়াভার মৃত্যু শুধু একজন জনপ্রিয় রাজকন্যার বিদায় নয়, বরং থাইল্যান্ডের রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা করেছে।
-বিবিসি




