দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, অনিরাপদ গর্ভপাত এবং মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে সরবরাহ সংকটের প্রভাব এখন শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি নারীর নিরাপত্তা, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি।’ দিবসটি সামনে রেখে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিবার পরিকল্পনা সেবার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অভাবে অনেক নারী অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভধারণ করছেন। একাধিক ক্ষেত্রে তাদের গর্ভপাতেও বাধ্য করা হচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, স্থানীয়ভাবে অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে গর্ভপাতের চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক নারী গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
জনস্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোতে নিয়মিত পিল, কনডমসহ প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না থাকায় বহু দম্পতি কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারছেন না। অনেক নারী বাধ্য হয়ে পিল ভাগ করে খাচ্ছেন, যা কার্যকর নয়। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে।
মেরি স্টোপস বাংলাদেশের লিড অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা মনজুন নাহার বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটের কারণে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হচ্ছেন এবং অনেককে গর্ভপাত করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ মাতৃমৃত্যুর প্রায় ২৯ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অনেক এলাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে না পারায় নারীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকারও হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর সংকট নারীর ক্ষমতায়ন, পারিবারিক অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ার পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু কমানোর অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেক এলাকায় আবারও বাড়িতে প্রসবের প্রবণতা বাড়ছে, যা মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, ২০২৪ সালে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত এবং মোট জন্মহার (টিএফআর) বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য দ্রুত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মাঠপর্যায়ে পরিবারকল্যাণ সহকারীদের কার্যক্রম জোরদার করা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, জনসংখ্যাকে শুধু সংখ্যা হিসেবে নয়, দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি দম্পতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।




