খারগ দ্বীপ কোথায়, কেন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু ইরানের এই গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের খারগ দ্বীপ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। বিশেষ করে গত শনিবার (১৪ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) খারগ দ্বীপের “সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু” ধ্বংস করেছে। তিনি এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা বলে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া সামরিক কমান্ড সতর্ক করে বলেছে— দেশটির তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে এর জবাবে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী তেল কোম্পানি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানা হবে।

কোথায় অবস্থিত খারগ দ্বীপ

খারগ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের উত্তরে, ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট প্রবাল দ্বীপ। প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি বুশেহর প্রদেশের অংশ এবং ইরানের তেল শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

দ্বীপটি তেল স্থাপনা ছাড়াও এখানে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক হরিণের জন্যও পরিচিত। বর্তমানে হরিণের সংখ্যা দ্বীপটির ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি বলে জানা গেছে।

ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র

ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই খারগ দ্বীপের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়। এখানে একটি বিশাল তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল ট্যাংকারে বোঝাই করা হয়।

ইরানের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে সমুদ্রের নিচে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খারগ দ্বীপে আনা হয়। এরপর দ্বীপের বড় বড় সংরক্ষণ ট্যাংকে তা জমা রাখা হয় এবং গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ডকের মাধ্যমে বিশাল ট্যাংকারে তেল লোড করা হয়। কারণ ইরানের উপকূলের অধিকাংশ এলাকা অগভীর হওয়ায় সেখানে বড় ট্যাংকার ভিড়তে পারে না।

খারগ দ্বীপে বর্তমানে ৪০টি বিশাল তেল সংরক্ষণ ট্যাংক রয়েছে, যেখানে ২ কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল মজুত রাখা সম্ভব।

কেন এই দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু

বিশ্লেষকদের মতে, খারগ দ্বীপে হামলা বা এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া গেলে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেহেতু তেল রপ্তানি ইরানের সরকারি আয়ের প্রধান উৎস, তাই এই দ্বীপে আঘাত করা মানে সরাসরি ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেওয়া।

কিছু মার্কিন বিশ্লেষক মনে করেন, দ্বীপটি দখলে নিলে ইরান সরকারের তেল রাজস্ব কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বড় আকারে ছড়িয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

খারগ দ্বীপ কেবল ইরানের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকে রপ্তানি হওয়া তেল ট্যাংকারগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালী হয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে।

এই পথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। ফলে খারগ দ্বীপে বড় ধরনের হামলা হলে বা তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে খারগ দ্বীপকে আঞ্চলিক সংঘাতে একটি সংবেদনশীল ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অতীতে হামলার ইতিহাস

১৯৬০-এর দশক থেকে খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মার্কিন তেল কোম্পানি অ্যামোকোর অংশগ্রহণে তখন এর অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।

আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাহত করতে এই দ্বীপে একাধিকবার বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। তবে তখনও দ্বীপের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত মেরামত করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খারগ দ্বীপকে সম্পূর্ণ অচল করতে হলে বড় আকারের ও দীর্ঘমেয়াদি হামলার প্রয়োজন হতে পারে।

দ্বীপের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য

খারগ দ্বীপে একটি ছোট বিমানবন্দর, শ্রমিকদের আবাসন এবং বিভিন্ন তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা রয়েছে। এখানেই আবু জার তেলক্ষেত্রের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রও অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগরে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র।

প্রায় আট হাজার মানুষের বসবাসের এই দ্বীপে ইসলামী আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাসও রয়েছে, যেখানে তেল ও সামুদ্রিক বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে খারগ দ্বীপের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পূর্বের খবরত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা
পরবর্তি খবরউন্নত চিকিৎসার জন্য মির্জা আব্বাসকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি