জয়ন্ত আচার্য
আজ ভারত–বাংলাদেশ মৈত্রী দিবস। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের সেই ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা ও মানবিকতার বন্ধন এক অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত একটি জাতির পাশে দাঁড়ানো, শত্রুপক্ষের বর্বরতা ঠেকাতে রাজনৈতিক,সামরিক, কূটনৈতিক সমর্থন দেওয়া এবং এক কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে বিরল নজির ভারত তৈরি করেছিল , বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে করেছিল, এই দিনে আমরা সেটিই স্মরণ করি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম নয়; তা ছিল মানবিক মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য জাতির চূড়ান্ত লড়াই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘৃণ্য গণহত্যা শুরু হওয়ার পর যখন পূর্ব বাংলার আকাশ দুঃস্বপ্নের মতো অন্ধকার হয়ে ওঠে, তখন লাখো মানুষ বাঁচার তাগিদে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নেয়। ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়া, পরিবার হারানো, গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস হওয়া মানুষের সেই আশ্রয়প্রার্থিতাকে ভারত যে মানবিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে মুহূর্তের মধ্যে গড়ে ওঠা অসংখ্য শরণার্থীশিবিরে অন্তত এক কোটি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া ছিল বিশাল মানবিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ। তবুও ভারত সরকার এবং সাধারণ মানুষ দু’হাত বাড়িয়ে এই বিপন্ন মানবসমুদ্রকে ধারণ করেছিল। খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয়, নিরাপত্তা-সীমিত সম্পদেও ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ একা নয়। ভারতের স্কুল–কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী, কৃষক, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক সবাই শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই শরণার্থী সংকট তুলে ধরতে ভারত বিশেষ ভূমিকা রাখে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে সহায়তা করে।
এই সংকটময় সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন মানবিক কূটনীতির এক অনন্য উদাহরণ। তিনি বুঝেছিলেন যে পাকিস্তানের নৃশংসতা শুধু একটি অঞ্চলের বিরুদ্ধে নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তাই তিনি সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে যুক্তি ও তথ্য সহকারে তুলে ধরেন পূর্ব বাংলায় চলমান গণহত্যা ও মানবাধিকার বিপর্যয়ের বাস্তবতা। ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন, প্যারিস থেকে মস্কো প্রতি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম নৈতিকতার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসনের পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের কারণে ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও চাপের জটিলতার মধ্যেও অটল থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারত যে বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, তা শুধু সামরিক ভারসাম্যই তৈরি করেনি; এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে মানবিকতার পক্ষে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তনীয়। ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ়তা, বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক সাহস বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে একটি বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক মাত্রা এনে দেয়।
অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাস ধরে জীবনপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান। অস্থায়ী সরকার, মুক্তাঞ্চল, গেরিলা আক্রমণ, প্রতিরোধ যুদ্ধ সব মিলিয়ে তারা পাক সেনাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সংগ্রাম সংগঠিত করেন। ভারত এই সংগ্রামের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিকসহ নানা দিক থেকে সহায়তা করে, যা মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ডিসেম্বর মাসে ভারতের সাথে পাকিস্তান যখন সরাসরি যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়, তখন ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনী সমন্বিত সামরিক অভিযানে নামে। পূর্বাঞ্চলে যে অভিযান চালানো হয়, তা সামরিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম। স্থল, নৌ ও বিমান ,সব অক্ষে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে। এই যৌথ অগ্রযাত্রার ফলে মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধেই পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এক নতুন জাতির জন্ম ঘটে। সেই বিজয়ের পিছনে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে যেমন বাংলাদেশের মানুষের অদম্য মনোবল ছিল, তেমনি ছিল ভারতের সামরিক সহায়তা, কূটনৈতিক অবস্থান ও মানবিক সাহস।
স্বাধীনতার ঠিক পরপরই ভারত প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। শুধু স্বীকৃতিই নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠন, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহযোগিতা সব ক্ষেত্রেই ভারত পাশে থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে ভারত অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এতে স্পষ্ট হয়েছিল—ভারত এই ভূমিকে দখল বা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি প্রতিবেশী জাতির মুক্তি ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যেই পাশে দাঁড়িয়েছিল।
ভুটানের পর যুদ্ধকালিন অবস্থায় ১৯৭১-এর ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় । ভারত আজকের ভারত-বাংলাদেশের মৈত্রী দিবস তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়, এটি ভবিষ্যতের অঙ্গীকারও। দুই দেশের বন্ধুত্ব কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি রক্তের, মানবতার, সংস্কৃতির ও স্বপ্নের সম্পর্ক। নানা টানাপোড়নের মধ্যও ১৯৭১ সালে যে মৈত্রী যুদ্ধজয়ের ভিত্তি হয়েছিল, আজ তা আঞ্চলিক শান্তি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, পরিবেশ সহযোগিতা ও জনগণের কল্যাণে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে নদী–নৌপথ পুনর্জাগরণ, সীমান্ত বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই এই বন্ধুত্ব একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানবিকতার এক ঐতিহাসিক উদাহরণ, যেখানে একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন আরেক জাতির সাহসিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলেমিশে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। যে ভারত এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, যে ভারত কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় বাংলাদেশের মুক্তির পথ সুগম করেছিল, সেই ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের বন্ধন অটুট রাখতে উচিত । মৈত্রী দিবস আমাদের সেই স্মৃতিকে নবায়ন করে এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করে। নৈতিকতার শক্তি যখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়, তখন ইতিহাস বদলে যায়; মানবিকতার শক্তি যখন প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতায় প্রকাশ পায়, তখন জন্ম নেয় নতুন একটি জাতি, নতুন একটি স্বপ্ন। ১৯৭১ সেই স্বপ্নই সত্যি করেছিল, আর আজকের মৈত্রী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সেই স্বপ্ন ভবিষ্যতের পথ নির্মাণেও এক অনির্বাণ আলোকশিখা ।




