FS Speech ICWA

Social Share

আমি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স (আইসিডব্লিউএ) এবং এর মহাপরিচালক ড. টি.সি.এ. রাঘবনকে ধন্যবাদ জানাই ‘মহামারী চলাকালীন ভারতীয় কূটনীতির বিস্তৃত পরিসর” নিয়ে এই মতবিনিময়ের আয়োজনের জন্য। আমি খুবই খুশি যে আমরা আজ দেশের বিভিন্ন স্থানের নামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্যানেলিস্টদের সাথে যোগ দিয়েছি।

২. আইসিডব্লিউএতে কথা বলা আমার পক্ষে সৌভাগ্যের বিষয়। একটি জাতির পরিচয় তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলি আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতাকে উপস্থাপন করে। আইসিডব্লিউএ আমাদের দেশ ও এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, যার জন্য আমরা সকলেই  গর্ব করতে পারি। এর শুরু স্বাধীনতার আগে।  বিশ্ব ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা থাকতে পারে সেটা সেই সময়ে আকাঙ্ক্ষার চেয়ে একটু বেশি ছিল। আমরা তখনও উপনিবেশ ছিলাম। ভারতের স্বাধীনতা, দেশভাগের ক্ষত এবং উদীয়মান জাতিসত্তার সংগ্রাম ছিল সামনে। তার পর থেকে ভারত অনেক দূর এগিয়েছে। আমাদের যাত্রা কঠিন ছিল এবং আরও অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। আমরা এমন একটি দেশ, যার মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা, অর্জন এবং অবিরাম প্রচেষ্টার ইতিহাস রয়েছে। আমরা একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী দেশ। আমরা এমন একটি দেশ যারা ভিন্ন কিছু করতে চায়। আমরা এমন একটি যা চ্যালেঞ্জকে ভয় পায় না।

৩. আমাদের খুব কঠিন সময়ে দেখা হচ্ছে। ২০২০ একটি চ্যালেঞ্জিং বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমরা বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতি শুরু হয়েছিল একটি স্বাস্থ্য সঙ্কট হিসেবে যা হয়ত ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর মত বা তীব্রতর। কিন্তু এটি একটি অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং একটি বিশাল সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রূপ লাভ করেছে যা আমাদের কেউই দেখিনি আগে। আট লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।  অসংখ্য মানুষ হারিয়েছে জীবিকা।

৪. আপনারা সবাই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় (এলএসি)চীনের সাথে আমাদের সংঘাতের বিষয়ে অবগত আছেন। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পরে এই সীমান্তে এই দুর্ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ। আমরা এই বিষয়ে সামরিক এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলির মাধ্যমে চীনের সাথে যোগাযোগ করছি এবং সংলাপের মাধ্যমে সমস্ত অমীমাংসীত বিষয় সমাধানের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রয়েছি।  আলোচনা চলাকালে আমরা আবার এই এই বিষয়ে ফিরে আসব।

৫. কোভিড-১৯ আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি বিষয় পরিস্থিতির জটিলতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ভারতীয় কূটনীতি এবং আমাদের বাহ্যিক নীতিগুলিও এর ব্যতিক্রম নয়।

৬. এই সমস্যাগুলির সাথে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করি  এবং আমরা সেগুলিকে সুযোগে রূপান্তর করতে সক্ষম কিনা – এই বিষয়গুলি জাতি হিসাবে আমাদের ভবিষ্যতের পথচলা প্রভাবিত করবে।

৭. মহামারী এবং লকডাউন আমাদেরকে বিশ্বায়নের কয়েকটি মৌলিক চালিকাশক্তিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা বর্তমানের বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকে রূপদান করে এমন অন্যান্য বিষয় সম্পর্কেও ভাবতে বাধ্য হয়েছি। এটি আমাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে।

৮. আমরা কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের সম্পর্ক এগিইয়ে নিয়ে যাই সে বিষয়ে  প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী সাম্প্রতিক ভার্চুয়াল ন্যাম এবং জি -২০ শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন যে, এই মহামারী বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং সীমাবদ্ধতাগুলি তুলে এনেছে। সংকীর্ণ অর্থনৈতিক এজেন্ডা এখনও পর্যন্ত বিশ্বায়নকে সংজ্ঞায়িত করেছে। আমরা সমস্ত মানবজাতির সম্মিলিত স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থকে ভারসাম্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা করেছি। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান জানান।

৯. ভারত বহু আগে থেকেই মানুষকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রচনার ক্ষেত্রে গঠনমূলক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা গ্লোবাল সাউথের অংশীদার দেশগুলির সাথে আমাদের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছি। আমরা আমাদের নিকট প্রতিবেশীদের ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, ইয়েমেন, ইরাক এবং মোজাম্বিকের মতো ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশগুলিতে মানবিক সহায়তা এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। আমরা বর্তমান মহামারীর সময় আমাদের অসংখ্য বন্ধু এবং অংশীদারদের সহায়তা করেছি। আমরা আন্তর্জাতিক সৌর জোট এবং দুর্যোগ প্রতিরোধক অবকাঠামোগত জোটের মতো গঠনমূলক ও সম্মুখমুখী এজেন্ডাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনে সহায়তা নিয়েছি।

১০. আমাদের বিশ্বব্যাপী চিন্তাভাবনা গঠনের প্রচেষ্টা এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মহামারীর মধ্যেও অব্যাহত রয়েছে। জি -২০ এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের ভার্চুয়াল বৈঠক আহ্বানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন করেছেন। এরপরে ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলন হয়। তিনি জাতিসংঘের ইকোসকের একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় ও গ্লোবাল ভ্যাকসিন সামিটে বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং মরিশাসের প্রধানমন্ত্রীর সাথে যৌথভাবে মরিশাসের নতুন সুপ্রিম কোর্ট ভবনের ডিজিটাল উদ্বোধন করেছিলেন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী ৬৪টিরও বেশি দেশের প্রধানমন্ত্রীদের সাথে ফোন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলেছেন।

১১. ভারতের পরামর্শ, অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নেতৃত্ব দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে প্রশংসা পেয়েছে।

১২. বিদেশমন্ত্রী মহামারী চলাকালীন প্রায় ৮০ জন প্রতিপক্ষের সাথে কথা বলেছেন। তিনি ডিজিটালি ব্রিকস, এসসিও এবং আরআইসির মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় অংশ নিয়েছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাঁর সহযোগীদের সাথে একটি যৌথ বৈঠক করেছেন।

১৩. আমি বিদেশী অফিসগুলিতে আমার সহকর্মীদের এবং এবং প্রতিপক্ষের সাথে নিয়মিত কথা বলেছি ও পরামর্শ করেছি এবং তা অব্যাহত রেখেছি।

১৪. সুতরাং এটি বলা ন্যায়সঙ্গত হবে যে আমরা ডিজিটাল কূটনীতিতে সর্বাগ্রে রয়েছি। কূটনৈতিক গতি তৈরি এবং বজায় রাখার জন্য আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা বহুমুখী হয়েছি।

১৫. ভারত একটি বৈশ্বিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশ। আমাদের অর্থনীতি এবং সকলের সামগ্রিক উন্নয়ন বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত। আমরা বিশ্বকে আন্তঃসংযুক্ত বাজারের সাথে সীমান্তহীন অর্থনীতি হিসাবে দেখি।

১৬. বিশ্বব্যাপী স্বার্থ ও অংশীদারিত্বের বিস্তার আমাদের অনেকগুলি জায়গায় দুর্বল করে তোলে। আবার, এটি আমাদের কাছে অনেক সুযোগও উন্মুক্ত করে। মহামন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সেকুলার ও টেকসই অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুগে চারটি বড় মন্দা একই ধরণের ধারা অনুসরণ করেছিল। আমরা বড় বড় স্বাস্থ্য সংকটের পরে চিকিত্সা বিজ্ঞান এবং জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছি।

১৭. এই সংকটটিও সুযোগ তৈরি করবে এবং আমরা সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়ার মতো অবস্থানে থাকতে চাই। আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার হল প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ভারতকে “বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের স্নায়ু কেন্দ্র” হিসেবে তৈরি করা। এটি তাঁর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ দৃষ্টিভঙ্গির সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিদেশ মন্ত্রণালয় অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়সমূহের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছে ভারতকে একটি বিকল্প উত্পাদন কেন্দ্র এবং উদ্ভাবনের গন্তব্য হিসাবে পরিচিত করার জন্য। বিভিন্ন অংশীদারদের সাথে পরামর্শ করে আমাদের কূটনৈতিক মিশন এবং পোস্টগুলির নেটওয়ার্ক বিভিন্ন দেশে আমাদের ব্যবসায়ের জন্য রপ্তানি এবং বিনিয়োগের সুযোগগুলি চিহ্নিত। আমরা  বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক সংস্থাগুলিরসাথে যোগাযোগ করছি যারা তাদের উত্পাদনকেন্দ্রগুলি স্থানান্তর করতে চায়।

১৮. প্রাথমিক মূল্যায়ন থেকে এমনটাই ধারণা পাওয়া যায় যে, স্বল্পমেয়াদে আমরা এমন খাতগুলিতে আমাদের বিশ্বব্যাপী উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলতে পারি যেখানে আমরা ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী হয়েছি যেমন- পোশাক, ওষুধ, রত্ন ও গহনা, রাসায়নিক ইত্যাদি। আমরা এই খাতগুলিতে উত্পাদন বাড়াতে পারি স্থানীয় এবং বৈশ্বিক উভয় চাহিদা পূরণ করার জন্য। মাঝারি ও দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের অবশ্যই ইলেক্ট্রনিক্স, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজাইন আউটসোর্সিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে মূল্য শৃঙ্খল বাড়িয়ে তুলতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চমূল্যযুক্ত ক্রিয়াকলাপের প্রতি। আমাদের শিল্পের সর্বত্র আধুনিক প্রযুক্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ উন্নয়নে কাজ করা দরকার।

১৯. এই মহামারীর মধ্যেও এমন ক্ষেত্র রয়েছে যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল স্পেস এমনই একটি ক্ষেত্র। আপনি বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি সংস্থাগুলি দ্বারা বৃহত বিনিয়োগগুলি উল্লেখ করতে পারেন – ভারতে গুগলের ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ফেসবুকের ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল মুবাডালার ১.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে।  এই অঞ্চলে আমরা যথেষ্ট প্রশংসিত। এই সরকার দ্বারা প্রবর্তিত জন ধন, আধার এবং মোবাইল – একটি ফিনটেক বিপ্লবের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী এর আগে ফিনটেক সংস্থাগুলি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সংযুক্ত করতে একটি বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, এপিআইএক্স চালু করেছিলেন। আমরা আমাদের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমগুলিকে আন্তঃব্যবহারযোগ্য করার জন্য বেশ কয়েকটি দেশের সাথেও কাজ করছি। আমাদের পেমেন্ট সিস্টেমগুলি, যেমন রূপে কার্ড, ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর, ভুটান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনে চালু হয়েছে।

২০. এরকমের একটি ফোরামে আত্মনির্ভর ভারত অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরা উচিত হবে। আমি এই অভিযান এবং আত্মনির্ভরতা সম্পর্কে আমার মতামত আগেই বলেছি এবং আমি এর কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে চাই। আত্মনির্ভরতা মানে কোন স্বার্থপর ব্যবস্থা নয় এর অপরিহার্য লক্ষ্য হল গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে মূল অংশগ্রহণকারী হিসাবে ভারতের অবস্থান নিশ্চিত করা। ঘরে বসে সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমরা বিশ্ববাজারে বিঘ্ন কমাতেও অবদান রাখতে পারি। এমন পণ্যগুলি শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ যেখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ উত্পাদন সম্প্রসারণের এবং বিশ্বব্যাপী প্রাপ্যতা বৃদ্ধির ক্ষমতা বা সম্ভাবনা রয়েছে। যে ভারত তার নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করছে এবং যে ভারত বৈশ্বিক ব্যবসা, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনে বড় ভূমিকা নিতে চাইছে তার মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই।

ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ,

২১. ভারত সর্বদা নিজেকে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে বিশ্বাস করেছে। আমাদের বিশ্বাস “বসুধৈবকুটম্বকম”, আমাদের মঙ্গল সামষ্টিক কল্যাণের মাঝেই নিহিত। আমরা “নিষ্কাম কর্ম”  নীতিতেও বিশ্বাস করি। অর্থাৎ যা কিছু ভাল তা এর নিজের প্রয়োজনেই করতে হবে।

২২. আমরা কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন এই শিক্ষাগুলি বাস্তবায়িত করেছি। এই সঙ্কটের সময়ে “বিশ্বের ফার্মাসি” হিসাবে ভারতের ভূমিকা সকলের নজরে এসেছে। আমাদের একটি বিশ্বমানের ওষুধ শিল্প রয়েছে যার রয়েছে বৈশ্বিক স্বীকৃতি। এই মহামারীতে ভারতে উত্পাদিত হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন  এবং প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের চাহিদার ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।

২৩. সরকারী ও একাধিক বেসরকারী ওষুধ সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে, ভারত নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করে বিশ্বজুড়ে বন্ধুদেশ এবং অন্যান্য দেশে এই ওষুধের বিশাল পরিমাণ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিল। লকডাউনের ফলে সৃষ্ট লজিস্টিকাল চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও  দেড় শতাধিক দেশে ভারতীয় ওষুধ ও চিকিত্সা সরবরাহ পৌঁছেছে।

২৪. মিশন সাগর, অপারেশন সঞ্জীবনী, বেশ কয়েকটি দেশে কোভিড মোকাবিলায় মেডিকেল র‍্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন, স্বাস্থ্য পেশাদার এবং স্বাস্থ্য সক্ষমতা  সংযোগ এগুলি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের কেন্দ্রীয় বিশ্বাস এবং আকাঙ্ক্ষাকে উপস্থাপন করে। এই প্রচেষ্টাগুলো বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে। এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভারত মহামারীর মাঝে বিশ্ব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক অবদান রেখেছে। আমরা এই অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে বিশ্বে এক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছি। এটি ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে উন্নীত করেছে এবং মহামারী-পরবর্তী বিশ্বে আমাদের স্থিতিশীল রাখবে।

২৫. নভেল রোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা হিসাবে এসেছে, এবং এটি বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। আমরা হয়ত সামনে বৈশ্বিক শক্তিতে ভারসাম্যগত পরিবর্তন দেখতে পাব। নতুন বহুপাক্ষিক কথোপকথনের উত্থান হবে এবং এই কথোপকথনে অংশীদারদের আপেক্ষিক শক্তিতে পরিবর্তন; এবং বিশ্বজুড়ে শক্তি, সংস্থান এবং ক্ষমতার বিস্তরণ ঘটবে।

২৬. এই নতুন বৈশ্বিক পরিবেশে ভারতের পছন্দ, চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগগুলিও প্রভাবিত হবে।

২৭. তবে কিছু জিনিস পরিবর্তন হবে না। আমাদের প্রতিবেশী প্রথমে নীতিও তেমন একটি বিষয়। আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশীদেরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। এর প্রমাণ এই মহামারীর শুরুতেই আমরা পেয়েছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আঞ্চলিক/বৈশ্বিক সংশ্লিষ্টতা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের সাথে। আমি বলতে পারি যে, মহামারীর মধ্যে আমার প্রথম বিদেশ সফর ছিল আমাদের প্রতিবেশী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাংলাদেশে।

২৮. আমাদের পররাষ্ট্র নীতির অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি হল অ্যাক্ট ইস্ট, যার মাধ্যমে আমরা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য একটি নতুন উদ্যোগ নিয়েছি। একাধিক চ্যানেলের মাধ্যমে আমাদের এই দেশগুলির সাথে ক্রমবর্ধমান সংলাপ রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ভারত ও আসিয়ান চিন্তাবিদদের এক বৈঠকে বলেছিলেন যে, “আসিয়ান বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির অন্যতম আন্তঃপথ। ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। আমরা কেবল একে অপরের নিকটবর্তীই নই, একসাথে এশিয়া ও বিশ্বকে  রূপদান করতেও সহায়তা করি। এই মুহুর্তে আমাদের প্রয়োজন একসাথে কাজ করা। “

২৯. আমরা প্রধানমন্ত্রীর ‘সুরক্ষা ও অঞ্চলের সকলের জন্য প্রবৃদ্ধি’ বা ‘সাগর’ দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আমাদের অংশীদারিত্ব জোরদার করেছি।

৩০. বিগত পাঁচ বছরে উপসাগর এবং পশ্চিম এশীয় দেশগুলিতে আমাদের থিঙ্ক ওয়েস্ট  নীতি  পররাষ্ট্রনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। মহামারীকালীন সময়ে উপসাগর এবং পশ্চিম এশিয়ায় আমাদের অংশীদাররা আমাদেরকে অবিচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে। এতে পারস্পরিক সুবিধার পাশাপাশি এবং পারস্পরিক বিশ্বাস বেড়েছে। রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্তরে আফ্রিকান দেশগুলিতে ৩০ টিরও বেশি সফর নিয়ে আফ্রিকার সাথে আমাদের যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দশকে ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেয়া হয়েছে আফ্রিকার দেশগুলিতে ।

৩১. আমরা আমাদের প্রতিবেশী এবং এর বাইরেও সুরক্ষা সরবরাহকারীর ভূমিকা গ্রহণ করেছি। কোভিড সংকটের এই কঠিন সময়ে আমাদের বন্ধুবান্ধব এবং অংশীদারদের সাহায্য করার জন্য আমাদের আগ্রহ দেখিয়েছি, বিশেষত যখন মহামারী মোকাবেলা করার জন্য বেশ কয়েকটি দেশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

৩২. আমাদের প্রতিশ্রুতি এবং আমাদের মূল দ্বিপাক্ষিক অংশীদারদের সাথে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আমি ইতোমধ্যে ভারত-ইইউ ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনের কথা উল্লেখ করেছি। আমি মহামারী চলাকালীন ডিজিটাল মাধ্যমে আমাদের কূটনৈতিক কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বজুড়ে আমাদের মূল অংশীদারদের সাথে একাধিক স্তরে বৈঠক। আমি এই জাতীয় বৈঠকের তালিকাটি পড়ব না তবে এটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাজের একটি বিস্তৃত ধারণা প্রকাশ করবে।

৩৩.  আমাদের আশেপাশের প্রচুর সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এগুলি সমাধানে আমরা যথাযথভাবে কাজ করব। তবে এটি অবশ্যই লক্ষণীয় যে, আমাদের সক্ষমতা এবং সংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ করার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত থাকব।

৩৪. আমি এর আগে জি -২০, ন্যাম এবং ইউএন সভায় প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছি। আমি ব্রিকস, এসসিও এবং আরআইসি বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেছি। আমরা বহুপক্ষীয় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বহুপাক্ষিক সিস্টেমের সাথে আমাদের কার্যক্রম বাড়ছে।

৩৫. আমি আবারও প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিতে চাই।  ইকোসকের উচ্চ পর্যায়ের সভায় তিনি বলেছিলেন, “ভারত দৃঢ়়ভাবে বিশ্বাস করে যে টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পথটি বহুপাক্ষিকতার মধ্য দিয়ে আসবে। পৃথিবীর বাসিন্দা হিসেবে,  অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এবং অভিন্ন লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে আমাদের অবশ্যই হাত মিলিয়ে যেতে হবে। বহুপক্ষীয়তাকে সমসাময়িক বিশ্বের বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করা দরকার। কেবলমাত্র জাতিসংঘকে সংস্কার করে নতুন বহুপক্ষীয়তার মাধ্যমে মানবতার আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ সম্ভব। ”

৩৬. আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জিং এবং ব্যস্ততাপূর্ণ এজেন্ডা রয়েছে। আমাদের ৭৫তম বার্ষিকীতে ভারত জাতিসংঘের সুরক্ষা কাউন্সিলের সদস্য এবং জি-২০ এর সভাপতি হবে। আগামী দুই বছরে আমরা ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সভাপতিত্ব করব। এগুলি আমাদের বর্ধিত বৈশ্বিক অবস্থানের স্বীকৃতি। সেই সাথে এগুলি আমাদের উপলব্ধি, আমাদের প্রত্যাশা এবং আমাদের অগ্রাধিকারগুলিকে বিশ্বের কাছে প্রকাশ করারও সুযোগ দেবে।

৩৭. আমরা আমাদের বন্ধুদের সাথে উন্নয়ন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে সংস্থান স্থাপন করি। এটি আমাদের সদিচ্ছা এবং সক্ষমতা এবং “সবার সাথে সবার উন্নতি” নীতিতে আমাদের বিশ্বাসের একটি বাস্তব প্রতিফলন। উন্নয়ন অংশীদারিত্ব একটি অগ্রগতিমূলক কাজ এবং আমরা কীভাবে অংশীদারিত্বগুলি বাড়াতে পারি এবং আমাদের বন্ধুদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী চাহিদা পূরণ করতে পারি তার দিকে লক্ষ্য রাখছি। আমাদের লক্ষ্য থাকবে টেকসই প্রকল্পসমূহ সম্পাদন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্ষমতা জোরদার করা।

৩৮. সন্ত্রাসবাদ ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকি হিসেবে সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে চলেছে। আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ভুগতে থাকা দেশ হিসাবে আমরা সন্ত্রাসী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অবিচল রয়েছি। যদিও এই ক্ষেত্রে আমাদের প্রচেষ্টাগুলির প্রতি বিশ্বব্যাপী সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও আমাদের নিশ্চিত করা দরকার যে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি নিরঙ্কুশ এবং দ্ব্যর্থহীন পদ্ধতি অনুসরণ করে। জাতিসংঘের তালিকাভুক্তির মতো বৈশ্বিক ব্যবস্থার রাজনৈতিককরণ এড়ানো দরকার। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, বিশ্বসম্প্রদায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত বিস্তৃত ধারণাকে চূড়ান্ত করে।

৩৯. আমাদের বায়ো-হুমকির মতো অপ্রচলিত সুরক্ষা চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য সাইবার কমনের প্রয়োজনীয়তাও মোকাবেলা করতে হবে।

৪০. আমাদের কূটনৈতিক মিশন এবং পোস্টগুলি বিদেশে ভারতীয়দের প্রয়োজনে প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা সঙ্কটের মাঝে আমরা মনে করিয়ে দিয়েছি। মন্ত্রণালয় হিসেবে আমরা সময়োপযোগী, কার্যকর এবং দক্ষ জনসেবা প্রদানের জন্য এবং বিদেশে আমাদের নাগরিকের প্রয়োজনের সাড়া দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

৪১. এই প্রসঙ্গে আমি আপনার দৃষ্টি বন্দে ভারত মিশনের দিকে আকৃষ্ট করে শেষ করতে চাই। স্থল, সমুদ্র এবং আকাশপথে মহামারী চলাকালীন ১.২ মিলিয়নেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক দেশে ফিরে এসেছেন। এটি সরকার কর্তৃক গৃহীত এ জাতীয় বৃহত্তম অনুশীলন যাতে একাধিক স্টেকহোল্ডার, একাধিক পর্যায়, একাধিক পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং একাধিক গন্তব্য অন্তর্ভুক্ত। কেউ যাতে বাদ না পড়ে সেজন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করে চলেছি।

৪২. যদি শেষ কথা বলতে হয় তবে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তি দিয়েই শেষ করব। তিনি বিপদ থেকে আশ্রয় না চেয়ে বরং এর মুখোমুখি হতে নির্ভয়ে থাকার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। সেই কথাগুলি আজ যথাযথ। এটা কোন সাধারণ সময় নয়। আমরা কেউ এই পরিস্থিতিতে থাকতে চাইনি। তবে এখন আমরা যেভাবে আছি, আমরা খাপ খাইয়ে নিতে এবং অগ্রসর হওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।