আগে পর্দার নায়ক ছিলাম, এবার মাঠের নায়কঃ ফেরদৌস

কালো কাচের টেবিল। আশেপাশে শুধু পুষ্পস্তবক। কালো রিভলভিং চেয়ারে সাদা পোশাক, সাদা শাল গায়ে বাংলাদেশের আওয়ামি লিগের নবনির্বাচিত সাংসদ ফেরদৌস আহমেদ। রাজনীতির ময়দানে তিনিই কি আগামীর লম্বা রেসের ঘোড়া? কেনই বা ২৫ বছরের বিনোদন কেরিয়ার ছেড়ে পর্দার নায়ক মাঠের নায়ক হলেন? উত্তর খুঁজতে ঢাকায় তাঁর মুখোমুখি তপশ্রী গুপ্ত।

প্রশ্ন: বিনোদন দুনিয়ায় দীর্ঘ ২৫ বছর, হঠাৎ কেন রাজনীতিতে?

ফেরদৌস: ব্যাপারটা কিন্তু হঠাৎ হয়নি। যদিও আমার কেরিয়ারে হঠাৎ করে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে। যেমন, বাসু চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবি (হাল্কা হাসি)। ছাত্রাবস্থাতেই আমি কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অবশ্যই সাংস্কৃতিক দিক থেকে। তখন হয়তো এরকম স্বপ্ন ছিল না। তখন স্বপ্ন ছিল নায়ক হব, অভিনেতা হব। ২০০১-এ প্রথম জাতীয় পুরস্কার পাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে। এর পর থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কের শুরু। ২০০৮-এর পর থেকে সেই সম্পর্ক আরও জোরালো হয়। তখন শিল্পীরা সরাসরি রাজনীতিতে আসতে চাইতেন না। নিরপেক্ষ থাকতে চাইতেন। আমার কাছে নিরপেক্ষ থাকা মানে চুপ করে থাকা। কারণ, কেউ নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। হয় পক্ষে নয় বিপক্ষে যেতেই হবে। তাছাড়া, আমার রাজনৈতিক আদর্শ থাকতেই পারে। যেমন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার আদর্শ। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা যখন রাজনীতিতে এলেন বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলে গেল। ওঁর জন্য বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের পরিচয় পেয়েছে। গত ১৫ বছর ধরে ওঁর সঙ্গে কাজ করছি। একটা সময়ের পরে মনে হল, সাধারণ মানুষের জন্য যদি কাজ করতে চাই, ভাল কিছু করতে চাই তা হলে সরাসরি রাজনীতিতে আসতে হবে। এভাবেই রাজনীতির আঙিনায় আমি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার হাতে ভরসা করে ঢাকা ১০-এর নৌকো তুলে দিয়েছেন। আমি আমার ১০০ শতাংশ দিয়ে তাঁর ভরসার মান রাখার চেষ্টা করেছি। নির্বাচনের ফল অনুযায়ী আমি বিজয়ী।

প্রশ্ন: এবারের নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাসের আবহ সৃষ্টি হয়েছিল। এদিকে আপনি বিখ্যাত নায়ক, কোথাও গেলেই জনজোয়ার। ভয় করেনি?

ফেরদৌস: (হেসে ফেলে) মবড হই। মানুষ কাছে আসে কারণ ভালবাসে বলে। একটু ছুঁয়ে দেখতে চায়। আমার তাতে ভয় নেই। কখনও মনে হয়নি, এই মানুষগুলো আমার সঙ্গে নৃশংস আচরণ করতে পারে। কারণ, ২৫ বছর ধরে আমি তাদের সঙ্গে আছি। অভিনয় দিয়ে তাদের মুগ্ধ করার চেষ্টা করেছি। সমাজের অনেক ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তাই ওঁদের থেকে আমার কোনও ভয় নেই। হ্যাঁ, এটা মনে হয়েছে, সবাই হয়তো আমার আদর্শ পছন্দ নাও করতে পারেন। ১০০ শতাংশ ভোট পাব এমনটাও ভাবিনি। এই প্রসঙ্গে ছোট্ট একটা ঘটনার কথা বলি?

প্রশ্ন: অবশ্যই…

ফেরদৌস: নির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন একটা ছোট ঘটনা ঘটে গিয়েছে আমার এলাকায়। যারা ঘটিয়েছে তারা অপরাধতন্ত্রে বিশ্বাসী, গণতন্ত্রে নয়। তাই চেয়েছিল, যে কোনও মূল্যে আমার জয়কে কলুষিত করতে। সারা বিশ্ব থেকে পর্যবেক্ষকেরা এসেছেন। সবাই দেখেছেন, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ অবাধ নির্বাচনের জন্য আমাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি ছিল না। তারপরেও ২২ নং ওয়ার্ডে ওরা ককটেল (বিস্ফোরক পদার্থ) মেরেছে। মোট তিন জন আহত। নিজে গিয়ে দেখে এসেছি। চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছি। এবং বুঝেছি, সবাই মানুষের কল্যাণ চায় না। যারা এই অঘটন ঘটিয়েছে তারা প্রধানমন্ত্রীকে মানে না। বাংলাদেশকে স্বীকার করে না। এদের হাতে দেশ যাওয়া মানেই অবনতির অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া। শীর্ষ বিচারকের বাড়িতে, ট্রেনে, বাসের কামরায় সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। দিনেদুপুরে পুলিশকে মেরে ফেলছে। তখন প্রশ্ন জাগে, মানবাধিকার কোথায়? তারপরেও বলব, যাঁরা বলেছিলেন বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না তাঁদের আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, এই দেশও পারে। সবাই কিন্তু খুশি।

প্রশ্ন: পর্যবেক্ষকেরাও বলেছেন সে কথা…

ফেরদৌস: হ্যাঁ, খবরে পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য দেখেছি।

প্রশ্ন: আপনার পরের ছবির শুটিং কবে?

ফেরদৌস: (হাসি) শপথ নেওয়ার পরে হাতের কাজ শেষ করব। আমার প্রযোজক-পরিচালকেরা দারুণ উত্তেজিত, খুব খুশি। জানিয়েছেন, এখন তাঁরা শুটিং ডেট চেয়ে একটুও বিরক্ত করবেন না। শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠান মেটার পরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফাঁকে শুট চলবে।

প্রশ্ন: এই দলে টালিগঞ্জের কোনও প্রযোজক আছেন?

ফেরদৌস: টলিউডে একটা ছবি করার কথা ছিল, ‘মীরজাফর চ্যাপ্টার ২’। নির্বাচনের চাপে কথা এগোতে পারিনি। এবার নিশ্চয়ই কথা বলব। কাজও হবে। টালিগঞ্জ তো আমার দ্বিতীয় বাড়ি। ওখানেও প্রচুর কাজ করেছি। ৯৮ সালে আমার পেশাজীবনের শুরুতে ওখানে অনেক ছবি করেছি।

প্রশ্ন: রাজনীতি আর অভিনয়ের জন্য সময় কীভাবে ভাগ করবেন?

ফেরদৌস: গত কয়েক বছর ধরে এমনিতেই ছবির কাজ কম করছি। বছরে একটা কিংবা দুটো। ওরকমই ভাল প্রোজেক্টে কাজ করব। বাকি সময় মানুষের জন্য কাজ করব। এর জন্য সময় বের করে নিতে খুব সমস্যা হবে না। মন থেকে চাইলে সব হয়। আশা, অভিনেতা ফেরদৌস আর রাজনীতিবিদ ফেরদৌস হাত মেলালে আগামীতে ভাল কিছুই হবে।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় বন্ধু ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ফোন করেছিলেন?

ফিরদৌস: (এবার চওড়া হাসি) হ্যাঁ, নির্বাচনের দিন ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পরেও।

সূত্রঃ সংসদ নির্বাচন অ সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে ভারতের জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম আজকাল ডট ইনকে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নায়ক ফেরদৌস। সেই সাক্ষাৎকার হুবুহু প্রকাশ করা হোল।

এস/ভি নিউজ

পূর্বের খবরপাবনা-৪ আসনে জামানত হারাচ্ছেন পাঁচজন পার্থী
পরবর্তি খবরবঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস কাল