পাঁচ হাজার বছর আগেই মিশরের সিংহাসনে নারী! নতুন গবেষণায় উন্মোচিত হলো ‘নারী রাজা’ মেরিটনিথের রহস্য

ভিনিউজ ডেস্ক : প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের ঘটনা। নীল নদের তীরবর্তী প্রাচীন মিশরে তখন রাজবংশের উত্থান-পতন চলছে। পুরুষ শাসকদের আধিপত্যে পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্র। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে এমন এক নারীর সন্ধান মিলেছে, যিনি কেবল রাজপরিবারের সদস্য কিংবা কোনো শাসকের স্ত্রী ছিলেন না, বরং পুরুষ রাজাদের সমকক্ষ হয়ে দীর্ঘ সময় মিশরের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর নাম মেরিটনিথ। এত দিন তাঁকে ঘিরে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে যে বিতর্ক ছিল, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তার অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে।

মেরিটনিথের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য ছিল। তিনি কি নিছক একজন রাজমাতা বা রানি ছিলেন, নাকি নিজেই রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন? নতুন গবেষণা বলছে, মেরিটনিথ সম্ভবত প্রাচীন মিশরের প্রথম রাজবংশের একজন পূর্ণাঙ্গ নারী শাসক ছিলেন। শুধু তাই নয়, প্রায় তিন দশক ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে।

চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস ইউনিভার্সিটির মিশরতত্ত্ববিদ স্যু কেলি এবং রোমানিয়ার ইউনিভার্সিটি অব বুখারেস্টের ডিজিটাল প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্রিস্টাল মিলার এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রাগ ইজিপ্টোলজিক্যাল স্টাডিজ’ সাময়িকীতে। গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল চিত্র বিশ্লেষণ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে বহু বছর ধরে অস্পষ্ট হয়ে থাকা প্রাচীন মিশরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শ্যের পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, মেরিটনিথের নাম পাওয়া গেছে ‘সেরেখ’ নামের একটি রাজকীয় প্রতীকে। প্রাচীন মিশরে রাজাদের নাম লেখার জন্য বিশেষ আয়তাকার প্রতীক ব্যবহার করা হতো, যার শীর্ষে থাকত বাজপাখিরূপী দেবতা হোরাসের চিহ্ন। এটি ছিল রাজক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এত দিন এই ধরনের রাজকীয় প্রতীকে পুরুষ শাসকদের নামই বেশি পাওয়া গেছে। নারীদের মধ্যে আগে নিথহোটেপের নাম পাওয়া গিয়েছিল। এবার একই ধরনের প্রতীকে মেরিটনিথের নাম শনাক্ত হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক মর্যাদা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে প্রায় ৭২ বছর আগের একটি অস্পষ্ট সাদা-কালো ছবি। প্রায় ৮০ বছর আগে মিশরের সাক্কারার একটি সমাধিক্ষেত্র থেকে মাটির তৈরি ১৩টি পাত্রের মুখ বন্ধ করার ছিপি উদ্ধার করা হয়েছিল। সেগুলোর গায়ে রাজকীয় সিলমোহর বা সেরেখের চিহ্ন ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে মূল প্রত্নবস্তু এবং সেগুলোর আলোকচিত্রের নেগেটিভ হারিয়ে যায়। গবেষকদের হাতে ছিল কেবল একটি পুরোনো, অস্পষ্ট ছবি।

আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকেরা ছবিটির রং ও বৈপরীত্য পরিবর্তন করে চিহ্নগুলো আলাদা করেন। পরে সেগুলোকে উচ্চ বৈপরীত্যের গ্রাফিক ছবিতে রূপান্তরিত করা হয়। এভাবেই অস্পষ্ট চিহ্নের মধ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেরিটনিথের নাম। প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ, হারিয়ে যাওয়া প্রত্ননিদর্শনের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই একটি পুরোনো ছবির মাধ্যমে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

মেরিটনিথের ক্ষমতার আরেকটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় আবিদোসে তাঁর সমাধিতে। সাধারণ রাজপরিবারের নারীদের সমাধির তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ। সেখানে বিপুলসংখ্যক মদের পাত্র পাওয়া গেছে। সমাধির চারপাশে রয়েছে প্রায় ৫০টি ছোট সমাধি ও প্রকোষ্ঠ। ধারণা করা হয়, মৃত্যুর পরও তাঁর সেবার জন্য অনুচর ও পরিচারকদের সেখানে সমাহিত করা হয়েছিল। এ ছাড়া তাঁর নাম খোদাই করা দুটি পাথরের স্মারক ফলক বা স্টেলার সন্ধান পাওয়া গেছে। এর একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটিতে তাঁর রাজকীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।

প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে নারীর শাসনক্ষমতা নতুন কোনো বিষয় নয়। পরবর্তী সময়ে হাটশেপসুত, নেফারতিতি ও ক্লিওপেট্রার মতো নারীরা ইতিহাসে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে মেরিটনিথের সময়কাল তাঁদের অনেক আগের। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ২৮৯০ অব্দের প্রথম রাজবংশের সময় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন বলে গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে।

এত দিন লিখিত ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে সোবেকনেফেরুকে মিশরের প্রথম নারী শাসক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে আরও প্রাচীন নারী শাসক নিথহোটেপের নামও উঠে এসেছে। এবার মেরিটনিথের নাম রাজকীয় সিলমোহরে শনাক্ত হওয়ায় প্রাচীন মিশরের ক্ষমতার ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মেরিটনিথ নামের অর্থ ‘নিথের প্রিয়’। প্রাচীন মিশরীয় ও লিবীয় সংস্কৃতিতে নিথ ছিলেন যুদ্ধ ও মাতৃত্বের দেবী। ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায় থেকে উঠে আসা এই নারী শাসক এখন প্রমাণ করছেন, পাঁচ হাজার বছর আগেও রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজক্ষমতার ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হারিয়ে যাওয়া নিদর্শনের একটি আবছা ছবি যে ইতিহাসের এত বড় রহস্য উন্মোচন করতে পারে, মেরিটনিথের কাহিনি তারই অসাধারণ উদাহরণ।

পূর্বের খবরআওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত’ দল যৌথভাবে চক্রান্ত করছে: রিজভী
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!