ডয়েসে ভেলের প্রতিবেদন : ইউরোপমুখী নিঃসঙ্গ অভিবাসী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ ডেস্ক: ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় বিপজ্জনক অভিবাসনপথে পা বাড়াচ্ছে হাজার হাজার শিশু-কিশোর। তাদের অনেকেই মা-বাবা কিংবা কোনো আইনগত অভিভাবক ছাড়াই পাড়ি দিচ্ছে ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ও স্থলপথের দীর্ঘ যাত্রা। জাতিসংঘের তিনটি সংস্থার নতুন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসী শিশুদের মধ্যে অভিভাবকহীন শিশুর অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই অভিবাসীদের উৎস দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপের ছয়টি দেশে মোট ৩১ হাজার ১০০ শিশু পৌঁছেছে। দেশগুলো হলো ইতালি, গ্রিস, স্পেন, বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস ও মাল্টা। এদের মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ শিশু ছিল অভিভাবকহীন। অর্থাৎ ইউরোপে পৌঁছানো শিশুদের ৬৭ শতাংশই কোনো মা-বাবা বা আইনগত অভিভাবক ছাড়াই যাত্রা করেছে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, শিশু অভিবাসীর মোট সংখ্যা কমলেও একা যাত্রা করা শিশুর অনুপাত বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপে পৌঁছানো শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪১ হাজার ৭০০। ২০২৫ সালে তা কমে ৩১ হাজার ১০০-তে নেমেছে। অর্থাৎ মোট আগমন ২৫ শতাংশ কমলেও অভিভাবকহীন শিশুর সংখ্যা ও অনুপাতের চিত্র নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইতালি অভিবাসী শিশুদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রায় ১৪ হাজার ১০০ শিশু পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এসেছে মিসর, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়া থেকে। ইতালি ও স্পেনে পৌঁছানো শিশুদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই ছিল অভিভাবকহীন। গ্রিসে আসা শিশুদের বড় অংশ আফগানিস্তান ও সিরিয়ার নাগরিক। অন্যদিকে স্পেনে আলজেরিয়া, মরক্কো ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শিশুরা বেশি পৌঁছেছে।

শুধু ইউরোপে পৌঁছানোর পথই নয়, যাত্রাপথের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ভূমধ্যসাগর, পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগরীয় পথ এবং পশ্চিম বলকান অঞ্চলে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি কিশোর ও তরুণের সাক্ষাৎকার নিয়েছে আইওএম। তাদের প্রায় অর্ধেক শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে সাক্ষাৎকার দেওয়া তরুণদের ২৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা হয়েছিল। ১৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের জোরপূর্বক কাজ করানো হয়েছে। লিবিয়ায় নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেছেন, নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় শিশুদের মানবপাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে তারা সহিংসতা, শোষণ ও নির্যাতনের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। কোনো শিশুরই একা এমন ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা আশ্রয়ের আবেদন করেছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ শিশু। তাদের ৭৯ শতাংশ প্রথমবারের মতো আবেদনকারী। অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসন ও স্থানান্তরের সুযোগও কমেছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় থাকা ৬ হাজার ৮০০ মানুষের মধ্যে শিশু ছিল ৩ হাজার ৪০০ জন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৯০০।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা শিশু-কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে ঠেলে দিচ্ছে। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সংকুচিত হলে মানবপাচারকারী চক্রের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

জাতিসংঘের তিন সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের দাবি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকহীন শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং অভিবাসনসংক্রান্ত কারণে শিশুদের আটক রাখা যাবে না।

বাংলাদেশের জন্যও এই প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসনের পথে বাংলাদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি নতুন নয়। বিশেষ করে ইতালিগামী বিপজ্জনক সমুদ্রপথে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। শিশু-কিশোরদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে রক্ষা করতে দেশে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি।

পূর্বের খবরডনের প্রতিবেদন : পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি, মুখোমুখি কেন্দ্র ও পিটিআই
পরবর্তি খবরনাটকের সূত্রে রাজনীতিতে হাতেখড়ি , ভারতের ছাত্র আন্দোলনের নতুন মুখ কে এই নেহা বোরা?
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!