জয়ন্ত আচার্য
সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক
ভিনিউজ : একটি মশার কামড়ে একটি শিশুর মৃত্যু-কথাটি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ঢাকার বাস্তবতায় এটি এখন নির্মম সত্য। ৮ বছর ১০ মাস বয়সী ফামইয়া মাশনুর রুমাইসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতারও নির্মম প্রতিচ্ছবি। চিকিৎসক বাবা-মায়ের সন্তান ফামইয়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর গুরুতর অবস্থার প্রচলিত কোনো লক্ষণই দেখায়নি। হঠাৎ খিঁচুনি, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, নাক দিয়ে রক্ত পড়া এবং শেষ পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু-সবকিছু ঘটেছে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে।প্রথম আলোর অন লাইনে ৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমার বিবেককে দারুন ভাবে নাড়া দিযেছে । প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবছর একই ঘটনা ঘটবে কেন? মানুষ আক্রান্ত হবে, হাসপাতাল রোগীতে ভরে যাবে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে, তারপর সিটি করপোরেশন মশক নিধন অভিযান জোরদার করবে-এই চক্র আর কত বছর চলবে?
৫ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৯ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯০২ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭১ এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৬০ জন। প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। অথচ প্রতিবছর আমরা সংখ্যাগুলো গুনে যাই, কয়েক দিন আলোচনা করি, অভিযান চালাই, তারপর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাই। এভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলা করা যায় না।
ডেঙ্গুকে শুধু একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এটি এখন নগর ব্যবস্থাপনার সংকট, পরিবেশগত সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের সংকট। মশা জন্মানোর পরিবেশ তৈরি হবে, কিন্তু আমরা শুধু মশা মারার ওষুধ ছিটাব-এটি কোনো বৈজ্ঞানিক সমাধান হতে পারে না। কোথায় এডিস মশা জন্মাচ্ছে, কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোন কীটনাশক কার্যকর, কোথায় ওষুধ প্রতিরোধী মশা তৈরি হয়েছে, কোন নির্মাণাধীন ভবন বা বর্জ্যস্থানে ঝুঁকি বেশি-এসব তথ্যের ভিত্তিতে বছরজুড়ে পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু রোগী বাড়ার পর তৎপর হওয়া মানে আগুন লাগার পর পানি নিয়ে ছুটে যাওয়া।

এই জায়গায় ঢাকার ইতিহাস আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। আজকের কংক্রিটের মহানগর একদিন নদী, খাল, জলাভূমি, বাগান ও সবুজের মধ্যে গড়ে উঠেছিল। ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সেই ঢাকা ছিল নদীনির্ভর, জলনির্ভর এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একটি শহর। নদীপথ ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রধান অবলম্বন। শহরের বিকাশ ঘটেছিল প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে নয়, বরং প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই। পরবর্তী সময়ে মুঘল আমলে ঢাকা বাণিজ্য, মসলিন, প্রশাসন ও জনবসতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। রমনা, বুড়িগঙ্গার তীর, খাল-বিল ও সবুজ অঞ্চল শহরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের অংশ ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে আমরা ঢাকার বিকাশকে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। খাল সংকুচিত হয়েছে, জলাভূমি ভরাট হয়েছে, নদী দূষিত হয়েছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়েছে, অপরিকল্পিত নির্মাণ বেড়েছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ হারিয়েছে। ফলে যেখানে একসময় জলপ্রবাহ ছিল, সেখানে এখন জলাবদ্ধতা; যেখানে ছিল সবুজ, সেখানে কংক্রিট; আর যেখানে ছিল পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সেখানে মশার প্রজননক্ষেত্র। ফামইয়ার বাবা নিজ বাসার পাশের ময়লার ভাগাড় ও জমে থাকা পানির কথা বলেছেন। এটি কেবল একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা নয়, ঢাকার অসংখ্য এলাকার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তাই শুধু মশা মারার কর্মসূচি নয়, ঢাকাকে নতুন করে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনকে বছরজুড়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করতে হবে। কীটতত্ত্ববিদদের নিয়মিত যুক্ত করে মশার ঘনত্ব ও কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন, খাল, জলাশয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগকে জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে রাজধানীর হাসপাতাল পর্যন্ত ডেঙ্গু চিকিৎসার একটি কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে যেন সংকটাপন্ন হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু নাগরিকের ওপর পুরো দায় চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আড়াল করার সুযোগ নেই। একজন নাগরিক নিজের বাড়ি পরিষ্কার করতে পারেন; কিন্তু রাস্তার ড্রেন, খাল, সরকারি জমি, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তার একার হাতে নেই। সেখানে দায়িত্ব স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কোন এলাকায় কী কাজ হচ্ছে, মশার ঘনত্ব কমছে কি না, ব্যবহৃত কীটনাশক কার্যকর কি না-এসব তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। একটি শিশুর মৃত্যু যদি শুধু ‘দুর্ভাগ্য’ বলে শেষ করে দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অর্থই বা কী?
ঢাকা শুধু একটি রাজধানী নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাস, নদী, মাটি, জল, সবুজ এবং মানুষের জীবনযাত্রার সম্মিলিত স্মৃতি। বুড়িগঙ্গার তীরে ইসলাম খানের হাতে যে শহরের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, সেই শহর আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর। কিন্তু উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে নিরাপদ না করে, প্রকৃতিকে যদি শহরের শত্রু মনে করা হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।
ঢাকায় ডেঙ্গু প্রতিবছর ফিরে আসার পেছনে শুধু আবহাওয়া দায়ী নয়; তীব্র জনঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ। বিপুল মানুষের বসবাসের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, জমে থাকা পানি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নালা-নর্দমার দুরবস্থা এডিস মশার প্রজননের অসংখ্য সুযোগ তৈরি করে। ফলে একটি এলাকায় আক্রান্ত মানুষ থাকলে ঘনবসতিপূর্ণ নগরে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণতা ও বৃষ্টির ধরন বদলানোও এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে কলকাতা বা সিঙ্গাপুরের মতো উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের অভিজ্ঞতা দেখায়, একই ধরনের পরিবেশ মানেই প্রতিবছর ভয়াবহ ডেঙ্গুতে বিপর্যস্ত হওয়া অনিবার্য নয়। কলকাতা পৌর করপোরেশন বহু বছর ধরে সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থলের তথ্যভান্ডার তৈরি, সারা বছর প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস এবং নির্মাণস্থল, বাজার ও জলাশয়ে নজরদারি চালিয়ে আসছে। সিঙ্গাপুর আরও এগিয়ে নিয়মিত মশার উৎস শনাক্তকরণ, কঠোর নজরদারি, জরিমানা ও নির্মাণকাজ বন্ধের ব্যবস্থা এবং ‘ওলবাকিয়া’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে; ২০২৬ সালের মধ্যে এ কর্মসূচি ৮ লাখের বেশি পরিবারের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মৌসুমি ওষুধ ছিটানো নয়, প্রয়োজন সারা বছর বৈজ্ঞানিক নজরদারি, নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক সমন্বিত ব্যবস্থা।
প্রতিবছর ডেঙ্গু আসবে, মানুষ মরবে, তারপর আমরা তৎপর হব-এই চক্র এবার ভাঙতেই হবে। মশা মারার মৌসুমি অভিযান নয়, প্রয়োজন বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, নদী-খাল-জলাভূমির পুনরুদ্ধার, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কার্যকর চিকিৎসা এবং সর্বোপরি জবাবদিহি। ফামইয়া মাশনুরের মতো আর কোনো শিশুর জন্মদিনের পোশাক যেন আলমারিতে পড়ে না থাকে-এই দায় শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো নগর ও রাষ্ট্রব্যবস্থার।এই মৃত্যু অধুনিক নগর সভ্যতায় মেনে নেওয়া যায় না ।




