নাইকির লোকসান ২৩০ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘নাইকি’ (Nike) নামটির অবস্থান ছিল একচ্ছত্র। বিশ্বসেরা অ্যাথলেটদের সঙ্গে চুক্তি, মনে রাখার মতো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর বিখ্যাত ‘স্লোগান’—‘জাস্ট ডু ইট’—এসবই ছিল প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

তবে আজ সেই বিখ্যাত স্লোগানটি যেন এক চরম ট্র্যাজেডির মুখে দাঁড়িয়ে। বিক্রিতে বড় ধস, শেয়ারবাজারে বিপুল পতন, হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই এবং কৌশলগত ভুলের জের ধরে এখন গভীর সংকটে বিশ্বখ্যাত এই মার্কিন ব্র্যান্ডটি।

নয়টি ত্রৈমাসিক ধরে নাইকির ব্যবসায় মন্দা চলছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে কোম্পানির রাজস্ব ৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২০ কোটি ডলারে। অন্যদিকে নিট মুনাফা ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ কোটি ডলারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—পরবর্তী অর্থবছরেও রাজস্ব এক অঙ্কের উচ্চ হারে কমতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই নিউইয়র্কে আফটার-আওয়ার্স ট্রেডিংয়ে নাইকির শেয়ারের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। বিগত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি তার শেয়ারমূল্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ হারিয়েছে।

সর্বোচ্চ শিখর থেকে এ পর্যন্ত নাইকির বাজারমূল্য থেকে প্রায় ২৩ হাজার কোটি (২৩০ বিলিয়ন) ডলার মুছে গেছে। মন্দার কারণে শীর্ষ ১০০টি মার্কিন কোম্পানির তালিকা ‘এসঅ্যান্ডপি ১০০’ সূচক থেকেও বাদ পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেয়ারবাজারের এই পতন আসলে মূল সমস্যার একটি লক্ষণ মাত্র। আসল প্রশ্ন হচ্ছে—এত বড় প্রতিষ্ঠানে ভুলটা কোথায় হলো?

পণ্য উদ্ভাবনে স্থবিরতা ও নতুন প্রতিযোগী

নাইকির মূল সমস্যা এটি নয় যে মানুষ খেলাধুলার জুতা কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। বরং আসল সংকট হলো—গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার মতো নতুন ও উদ্ভাবনী পণ্য তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

নাইকির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দৌড়-সহ মূল স্পোর্টস বিভাগে কিছুটা অগ্রগতি হলেও তাদের দৈনন্দিন ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ক্যাটাগরিতে চরম মন্দা চলছে। বিশেষ করে ‘নাইকি স্পোর্টসওয়্যার’ এবং বিশ্বখ্যাত ‘জর্ডান’ ব্র্যান্ডের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘কনভার্স’-এর রাজস্ব সাম্প্রতিক প্রান্তিকে কমেছে ২৮ শতাংশ

একসময় নাইকির এয়ার ফোর্স ১, ডাঙ্ক কিংবা এয়ার জর্ডানের মতো জুতা কেবল অ্যাথলেটদের ব্যবহার্য ছিল না, এগুলো হয়ে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মের সামাজিক মর্যাদা ও ফ্যাশনের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুইজারল্যান্ডের ‘অন রানিং’ এবং ‘হোকা’ (Hoka)-এর মতো উদীয়মান ব্র্যান্ডগুলো দৌড়বিদ ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

স্পোর্টস খুচরা শিল্প বিশ্লেষক ম্যাট পাওয়েল বলেন, ‘তারা পণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে বেশি নজর দিতে গিয়ে মূল উদ্ভাবনে (আর অ্যান্ড ডি) লাগাম টেনে ধরেছিল। কেউ কেউ মশকরা করে বলতেন, নাইকি নাকি নিজেকে “ইবে” (eBay)-তে পরিণত করতে চাচ্ছে।’

এমবাপ্পে ও তারকা খেলোয়াড়দের প্রস্থান

নাইকির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিশ্বমঞ্চের তারকাদের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক। আশির দশকে বাস্কেটবল তারকা মাইকেল জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি করে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাস গড়েছিল নাইকি। পরবর্তীতে টাইগার উডস, সেরেনা উইলিয়ামস ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরা ছিলেন নাইকির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নাইকির সেই জৌলুশে বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৪ সালে টাইগার উডস নাইকির সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানেন। এরপর সবচেয়ে বড় চমক আসে যখন ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে নাইকির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে সুইস প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড ‘অন’-এ যোগ দেন। এর কিছুদিন আগেই তরুণ স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামাল নাইকি ছেড়ে যোগ দেন ‘অ্যাডিডাস’-এ।

এমবাপ্পের এই বিদায় নাইকির জন্য বড় মানসিক ও ব্যবসায়িক আঘাত। কারণ এর ফলে অ্যাথলেট ও তাঁদের ভক্তদের কাছে নাইকি এখনো প্রথম পছন্দ কি না—সে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।

ই-কমার্স নির্ভরতা ও চীনা বাজারে ধস

নাইকির এই বিপত্তির পেছনে তাদের বিগত কয়েক বছরের বিপণন কৌশলকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক প্রধান নির্বাহী জন ডোনাহোর অধীনে নাইকি ‘ডিরেক্ট-টু-কনজিউমার’ (ডিটিসি) মডেলে অতিরিক্ত ঝুঁকিয়ে পড়ে। তারা সাধারণ খুচরা বিক্রেতা ও স্টোরগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে কেবল নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অ্যাপে পণ্য বিক্রি জোরদার করে।

এর ফলে সাধারণ সুপারশপ ও দোকানে নাইকির উপস্থিতি কমে যায়, আর সেই খালি জায়গা দখল করে নেয় ‘অন’ বা ‘হোকা’-র মতো নতুন ব্র্যান্ডগুলো। বর্তমান সিইও এলিয়ট হিল দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও সাধারণ খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, নাইকির সবচেয়ে বড় ও লাভজনক আন্তর্জাতিক বাজার চীনে বিক্রি মারাত্মকভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে চীনে নাইকির রাজস্ব কমেছে ২২ থেকে ২৬ শতাংশ। স্থানীয় চীনা ব্র্যান্ডগুলোর উত্থান এবং ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে নাইকি।

পুনর্গঠন ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা

পরিস্থিতি সামাল দিতে নাইকি তাদের ব্যবসায়িক রূপান্তরের জন্য ‘পেস’ (Pace) নামক একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর আওতায় সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন, আঞ্চলিক বিভাগ কমানো এবং বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২৫০ কোটি ডলার ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্য নিয়েছে তারা।

তবে এই পুনর্গঠন বাস্তবায়নে কোম্পানিকে অগ্রিম-কর বাবদ প্রায় ১০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হবে, যার একটি বড় অংশ যাবে ছাঁটাইকৃত কর্মীদের ভাতা প্রদানে।

একই সঙ্গে নাইকি ভারতের বেঙ্গালুরুতে একটি নতুন ক্যাম্পাস খোলার পরিকল্পনা করছে। এখান থেকে নাইকি, জর্ডান এবং কনভার্স ব্র্যান্ডের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পরিচালনা করা হবে।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

নাইকি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্পোর্টস ব্র্যান্ড এবং বিশ্বজুড়ে তরুণদের মাঝে এর বিপুল গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে একসময় যেভাবে বিশ্ববাজারে একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল, সেখানে যে বড় ধরনের চিড় ধরেছে তা স্পষ্ট।

অবসর থেকে ফিরে আসা নাইকির অভিজ্ঞ সিইও এলিয়ট হিল এবং তাঁর দল এখন ‘স্পোর্ট অফেন্স’ কৌশলে মনোযোগ দিচ্ছেন।

শিল্প বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নাইকি তাদের আগের প্রবৃদ্ধি ও মুনাফায় ফিরতে পারবে, তবে সেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথটি কোনো দ্রুত দৌড় নয়, বরং একটি দীর্ঘ ‘ম্যারাথন’। দশকজুড়ে ‘জাস্ট ডু ইট’ বলে মানুষকে অনুপ্রাণিত করা নাইকিকে এখন নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা ঠিক কী করবে, আর কী বর্জন করবে।

পূর্বের খবরসান্ত্বনার ব্রোঞ্জও জিততে পারলেন না লিটনরা
পরবর্তি খবরডিজিটাল হচ্ছে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন: আইনমন্ত্রী
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!