রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শীতকালেও গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই শীর্ষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কিয়েভে বৈঠকের পর তিনি বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে পরিস্থিতি এখন শীত পর্যন্ত গড়ানোর দিকেই যাচ্ছে।
রোববার কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বৈঠক শেষে বড় কোনো অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথম ট্রাম্পের বিশেষ দূত উইটকফ ও কুশনার ইউক্রেন সফর করলেন। এর ঠিক আগের দিন তারা মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
কিয়েভে আলোচনার পর উইটকফ বৈঠকটিকে ‘আশাব্যঞ্জক’, গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একটি ভালো সমাধানে পৌঁছানোর বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী। মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেও ‘অনেক অগ্রগতি’ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মার্কিন প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য জ্যারেড কুশনার জানান, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় এমন বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে কথা হয়েছে, যেগুলো এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এরপর দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য কী কী উপাদান প্রয়োজন, তা নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। পুতিনের সঙ্গে ‘খুব ভালো সংলাপ’ হয়েছে উল্লেখ করে কুশনার বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট নানা প্রশ্ন করেছেন এবং মার্কিন প্রতিনিধিরাও তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছেন।
কিয়েভে বৈঠকের পর জেলেনস্কি বলেন, তিনি এমন একটি ন্যায়সংগত শান্তি চান, যাতে রাশিয়া ভবিষ্যতে আবার ইউক্রেনের ওপর আগ্রাসন চালানোর সুযোগ না পায়। যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
জেলেনস্কি আরও জানান, ইউক্রেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা শিগগিরই আবার বৈঠকে বসবেন। পাশাপাশি রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সরাসরি আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
যুদ্ধ শীতকাল পর্যন্ত গড়ালে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে বিমান প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা করা। জেলেনস্কি বলেন, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা প্রয়োজন হবে। রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেন বর্তমানে মার্কিন নির্মিত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুতেও চাপ রয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনকে নিজেদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র আগামী বছর প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এবং ইউক্রেন সেই সহায়তার ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে মার্কিন দূতদের কিয়েভ সফরের মধ্যেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত ছিল। ইউক্রেনের দাবি, তারা রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগার, একটি বিমানঘাঁটি এবং দুটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া ১০৮টি দূরপাল্লার ড্রোন ও কয়েকটি ছোট ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ৮২টি ড্রোন ও ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করেছে। তবে বেশ কয়েকটি স্থানে হামলা ও ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে শনিবার মস্কোর ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে উইটকফ ও কুশনারের বৈঠক প্রায় তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। রুশ প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বৈঠকটিকে গঠনমূলক ও অত্যন্ত খোলামেলা বলে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সমাধান, অর্থনৈতিক বিষয় এবং সম্ভাব্য রুশ-মার্কিন যৌথ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এখনো জটিল। রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষই আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। জেলেনস্কির শীতকাল পর্যন্ত যুদ্ধ চলার আশঙ্কা সেই অনিশ্চয়তাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।




