জন্মাষ্টমীর মিছিল: ঢাকার রাজপথে ৫০০ বছরের ঐতিহ্যকে ফিরে দেখা

জয়ন্ত আচার্য
সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক

ভিনিউজ : ঢাকার রাজপথে আজ আবারও যেন ফিরে এসেছিল কয়েক শতাব্দী আগের সেই শহর। ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টা, কীর্তনের সুর আর মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছিল চারপাশ। রঙিন সাজে এগিয়ে চলছিল রথ, কোথাও রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি, কোথাও কংসের কারাগারের দৃশ্য, কোথাও কৃষ্ণের বাল্যলীলা। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুক্রবার বের হওয়া জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য মিছিল শুধু একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা ছিল না; এটি যেন ইতিহাসের বুক চিরে বর্তমানের কাছে ফিরে আসা ঢাকার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।

জন্মাষ্টমীর মিছিল ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো ঐতিহ্যগুলোর একটি। এর শিকড় এমন এক সময়ে, যখন আজকের ব্যস্ত মহানগর ঢাকা এখনও মুঘল রাজধানী হয়ে ওঠেনি। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ১৫৫৫ সালে বংশালের কাছে এক সাধুর উদ্যোগে রাধাষ্টমী উপলক্ষে বালক ও ভক্তদের নিয়ে একটি শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল। প্রায় এক দশক পর, ১৫৬৫ সালে শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে সেই আয়োজনই আরও জাঁকজমকপূর্ণ জন্মাষ্টমীর মিছিলে রূপ নেয়। পরে নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কৃষ্ণদাস বসাকের পরিবারের ওপর এর দায়িত্ব পড়ে।

সেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে মিছিল শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল ঢাকার মানুষের উৎসব। মিছিলের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন নানা শ্রেণি-পেশা ধর্মের মানুষ। ভালোবেসে তারা জন্মাষ্টমীর মিছিলকে ডাকতেন ‘বার গোপালের মিছিল’ নামে। ঐতিহাসিক বর্ণনায়ও উঠে এসেছে, ব্রিটিশ আমলে জন্মাষ্টমীর মিছিলে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ ছিল এবং একসময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুধু এই মিছিল দেখতেই ঢাকায় আসতেন।

ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায় , তখনকার জন্মাষ্টমীর মিছিল ছিল আজকের দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। বিশাল কাঠের মঞ্চ বা চৌকিতে সাজানো হতো কৃষ্ণ, বলরাম, নন্দ, যশোদাসহ নানা চরিত্রের প্রতিকৃতি। গোপ-গোপী ও ব্রজবাসীর সাজে মানুষ অংশ নিতেন। কোথাও নৃত্য, কোথাও গান, কোথাও পৌরাণিক কাহিনির অভিনয়-সব মিলিয়ে মিছিল পরিণত হতো চলমান এক লোকনাট্যে। হাতি, ঘোড়া, পালকি, হাওদা, পতাকা, নিশান আর নানা রঙের সাজসজ্জায় পুরোনো ঢাকা যেন সেদিন অন্য এক নগরে পরিণত হতো।

১৭২৫ সালের দিকে ইসলামপুরের ব্যবসায়ী গদাধর ও বলাইচাঁদ বসাকের নেতৃত্বে আরেকটি জন্মাষ্টমীর মিছিল বের হতে শুরু করে। ফলে নবাবপুর ও ইসলামপুর-দুই পক্ষের আলাদা মিছিল হয়ে ওঠে ঢাকার উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। আয়োজনের জাঁকজমক নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতাও শুরু হয়। কিন্তু একসময় সেই প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন দুই পক্ষের মিছিলের জন্য আলাদা দিন নির্ধারণ করে দেয়।

উনিশ শতকে এসে জন্মাষ্টমীর মিছিল আরও জমকালো হয়ে ওঠে। এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। সমগ্র ঢাকা তখন যেন পরিণত হতো উৎসবের নগরীতে। ধর্মীয় আচার থাকলেও মিছিলের চরিত্রে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় লোকসংস্কৃতি, বিনোদন, শিল্প ও সামাজিক অংশগ্রহণ। জন্মাষ্টমীর মিছিল হয়ে ওঠে এমন এক আয়োজন, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি প্রকাশ পেত মানুষের সৃজনশীলতা ও মিলিত আনন্দ।

 

কিন্তু ইতিহাস সবসময় একই পথে হাঁটে না। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা মিছিলের স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করে। বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিঘাত পড়ে এই ঐতিহ্যের ওপর। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকার বহু হিন্দু পরিবার দেশত্যাগ করলে মিছিলের পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমীর মিছিল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

তারপর দীর্ঘ নীরবতা। যে রাজপথ একসময় কৃষ্ণের জন্মোৎসবের আনন্দে কাঁপত, সেখানে আর শোনা গেল না সেই পুরোনো বাদ্য। প্রজন্ম বদলে গেল, শহর বদলে গেল, পুরোনো ঢাকার অনেক চেহারা হারিয়ে গেল। কিন্তু স্মৃতি হারাল না।

স্বাধীনতার পর আবার ছোট পরিসরে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৮৯ সালে ঢাকা মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে জন্মাষ্টমীর মিছিল নতুন করে শুরু হয়। প্রবীণদের কাছ থেকে পুরোনো মিছিলের স্মৃতি নিয়ে তার আঙ্গিক ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।

সেই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার আবারও ঢাকার রাজপথে নেমেছিল জন্মাষ্টমীর মিছিল। সকাল ৮টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কীর্তন ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় উৎসব। তবে দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বের হওয়া মিছিলটি পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, বঙ্গবাজার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবন, গোলাপশাহ মাজার, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায় সাহেব বাজার মোড় হয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের পথে পথে জড়ো হন অসংখ্য মানুষ। ঢাকার বাইরে থেকেও ভক্তরা এসে যোগ দেন এই আয়োজনে।

আজকের মিছিলেও ছিল পুরাণের নানা দৃশ্যের উপস্থাপন। রথ, রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি, কংসের কারাগার, কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা-সবকিছু মিলিয়ে শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে এক চলমান ক্যানভাস। ভক্তদের কেউ কৃষ্ণ, কেউ রাধা, কেউ গোপ-গোপীর সাজে অংশ নেন। কোথাও কীর্তন, কোথাও নৃত্য, কোথাও বাদ্যের তালে তালে মানুষের উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে পুরোনো ঢাকার রাজপথে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরার কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের ঘরে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায়, সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাঁর জন্মতিথি পালন করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই জন্মাষ্টমীর উৎসব। কিন্তু ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিলের তাৎপর্য তার চেয়েও বিস্তৃত।
কারণ এই মিছিলের ইতিহাসে শুধু ধর্ম নেই, আছে মানুষের ইতিহাস। আছে পুরোনো ঢাকার জীবনযাত্রা। আছে কারিগর, শিল্পী, ব্যবসায়ী, ভক্ত ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। আছে এমন এক সময়ের স্মৃতি, যখন একটি ধর্মীয় উৎসবও পুরো শহরের উৎসবে পরিণত হতে পারত।

সবচেয়ে বড় কথা, জন্মাষ্টমীর মিছিল ঢাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক স্মারক। যে মিছিলে একসময় ধর্ম বর্ন ভেদে পাশাপাশি হাঁটতেন, সেই স্মৃতি আজও এই উৎসবকে আলাদা মর্যাদা দেয়। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, পরস্পরের উৎসবে অংশ নেওয়া এবং একই শহরের নাগরিক হিসেবে একসঙ্গে দাঁড়ানোর যে সংস্কৃতি ঢাকার পুরোনো সমাজে ছিল, জন্মাষ্টমীর মিছিল তার অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন।

আজকের মিছিলে হয়তো নেই সেই পুরোনো হাতি-ঘোড়ার বহর, নেই সোনা-রুপায় মোড়ানো বিশাল আয়োজন, নেই আগের মতো রাজকীয় জাঁকজমক। কিন্তু আছে ইতিহাসের উত্তরাধিকার। আছে হারিয়ে যাওয়া দিনের প্রতি টান। আছে নতুন প্রজন্মের হাতে পুরোনো ঐতিহ্য তুলে দেওয়ার চেষ্টা।

তাই ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে আজ যে মিছিল বের হলো, তাকে শুধু একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা বললে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি আসলে ঢাকার স্মৃতির মিছিল-একটি শহরের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর মিছিল। এর প্রতিটি পদক্ষেপে যেন পুরোনো ঢাকার গলি থেকে ভেসে আসে কয়েক শত বছরের গল্প।

সময় বদলেছে, ঢাকা বদলেছে, মানুষের জীবন বদলেছে। তবু কিছু ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না। তারা ফিরে আসে উৎসবের দিনে, মানুষের ভিড়ে, ঢাকের শব্দে, কীর্তনের সুরে। জন্মাষ্টমীর মিছিলও তেমনই এক ঐতিহ্য-যে মিছিল একদিন থেমে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। আজ ঢাকার রাজপথে তার ফিরে আসা যেন সেই কথাই বলে-ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।

পূর্বের খবরঅপশক্তির বিরুদ্ধে সনাতনীরা সরকারের পাশে থাকবে, আইনমন্ত্রীর আশা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!