দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হবে। সংসদ সদস্য হওয়ায় মির্জা ফখরুল ভোট দিতে পারবেন। তবে সংসদ সদস্য না হওয়ায় অলি আহমদ ভোটার তালিকায় নেই। তাই ভোট দিতে তো পারবেনই না, এমনকি ভোটকেন্দ্র সংসদ কক্ষেও প্রবেশের সুযোগ পাবেন না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন ৩৪৯ সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ৫০ জন। চট্টগ্রাম-৪ আসন শূন্য থাকায় মোট ৩৪৯ জন ভোটারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
অসুস্থতাজনিত কারণে দেশের বাইরে থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এ বিষয়ে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন তিনি। চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হতে একজন প্রার্থীকে ১৭৫ ভোট পেতে হবে। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। দলটির মিত্র বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য রয়েছেন ৯০ জন। তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন এবং জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচিত জাগপার একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন এবং খেলাফত মজলিসের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের শুরুতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ভোটদানও সম্প্রচার করা হবে। এরপর ভোটগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। ভোট গণনার সময় আবার সরাসরি সম্প্রচারে ফিরবে বিটিভি।
গতকাল বুধবার ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি জানান, ভোট গ্রহণের শুরুতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর ভোটদান বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এরপর সম্প্রচার বন্ধ থাকবে এবং ভোট গণনার সময় আবার সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে। ভোট গণনা শেষে সংসদ কক্ষেই ফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনী কর্তা। পরে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদের অধিবেশন বর্তমানে চলমান না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করার পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বও পালন করবেন সিইসি।
সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে ভোট দেবেন। ভোট দেওয়ার আগে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে ব্যালট গ্রহণ করবেন তাঁরা। এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালও সংসদ সদস্য হিসেবে ভোট দিতে পারবেন। তাঁদের ভোট দেওয়ার জন্য সংসদ কক্ষে পৃথক আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য হওয়ায় ভোট দেওয়ার অধিকার রাখছেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে। অন্যদিকে অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারবেন না এবং সংসদ কক্ষে প্রবেশের সুযোগও থাকছে না।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। এর আগে গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণে গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ওই বছরই প্রথম সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপি ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে বিএনপি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর অনুষ্ঠিত সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থী দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ভোট গ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।




