হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা, জাহাজে হামলার পর ফের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত; নিখোঁজ ভারতীয় নাবিককে ঘিরে উদ্বেগ

 

ভিনিউজ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, ইরানের প্রণালি বন্ধের ঘোষণা এবং তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সামরিক হামলায় পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার শিকার জাহাজটিতে থাকা ১১ ভারতীয় নাবিকের মধ্যে একজন এখনও নিখোঁজ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত সরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সরাসরি হামলা চালায়। এতে জাহাজটির ইঞ্জিনরুম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেটি আর যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারেনি। জাহাজের একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, অনুমোদিত নৌপথ থেকে সরে গিয়ে একটি জাহাজ আইন লঙ্ঘন করায় প্রথমে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। নির্দেশনা অমান্য করায় সতর্কতামূলক গোলাবর্ষণ করা হয় এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে আইআরজিসি। তাদের দাবি, কেবল ইরানের নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ ব্যবহার করেই জাহাজ চলাচল করতে হবে।

এই ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা শুরু করে। সেন্টকমের ভাষ্য, চলতি সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার পরও ইরানকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, “ইরান একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।”

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে হামলার ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আক্রান্ত জাহাজটিতে ১১ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ওমানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার অভিযান পর্যবেক্ষণ করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও অসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী। তারা অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। বৈশ্বিক তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওমান উপকূলের কাছে তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার পর থেকেই উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এসব হামলার পেছনেও ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে তেহরান দাবি করেছে, ঘটনাগুলোর কিছু ছিল ভুল বোঝাবুঝির ফল এবং তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সংঘর্ষ চললেও আলোচনার পথ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন।

অন্যদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভাষণে প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, দেশের শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটি শুধু একজন নেতার নয়, পুরো জাতির অঙ্গীকার।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। সম্প্রতি নিজ শহর মাশহাদে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক এই সংঘাত কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়েই অনুভূত হতে পারে।

পূর্বের খবরঅবিস্মরণীয় ঘটনা : ইতিহাসে প্রথমবার র‍্যাংকিংয়ের সেরা চার দল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে
পরবর্তি খবরপ্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ধানমণ্ডি-গুলশান লেক সংস্কারবিষয়ক বৈঠক
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!