মেহেরপুরের ইতিহাসে আইন, সমাজসেবা, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যাঁদের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁদের অন্যতম হলেন প্রয়াত অ্যাডভোকেট প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, সমাজসেবক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কবি এবং প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবকল্যাণ এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য ১৯৯৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও মেহেরপুরের আইনাঙ্গন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং প্রগতিশীল সমাজে তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
ঐতিহ্যবাহী আইনজীবী পরিবারের উত্তরসূরি
প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী ভট্টাচার্য পরিবারের সন্তান। তাঁদের আদি নিবাস ছিল মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী গ্রামে। শতাধিক বছর আগে পরিবারটি মেহেরপুর শহরের হোটেল বাজার এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
তাঁর পিতা স্বর্গীয় নলীনাক্ষ ভট্টাচার্য (১৯১৩–১৯৬৭) ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম প্রখ্যাত আইনজীবী এবং মেহেরপুর বার কাউন্সিলের সভাপতি। আইন পেশায় দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও সততার জন্য তিনি সর্বমহলে সম্মানিত ছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরও তিনি দেশত্যাগ না করে মেহেরপুরেই থেকে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর হাত ধরেই ভট্টাচার্য পরিবারের আইন পেশার যে ঐতিহ্যের সূচনা, তা পরবর্তী প্রজন্মেও সফলভাবে অব্যাহত থাকে।
আইন পেশায় অসামান্য অবদান
পিতার আদর্শ অনুসরণ করে প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং দীর্ঘ সময় মেহেরপুর জেলা আদালতে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে আইন ব্যবসা পরিচালনা করেন। তিনি মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সততা, প্রজ্ঞা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধেয় ছিলেন।
আইন পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে তিনি নিজের বাড়ির নাম রাখেন ‘ল-গার্ডেন’। এই নামটি শুধু একটি বাড়ির পরিচয় নয়, বরং একটি শতবর্ষী আইন ঐতিহ্যের প্রতীক।
প্রগতিশীল রাজনীতি, সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন
প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য শুধু আদালতের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি মেহেরপুরের বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন এবং স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে আজীবন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন।
তিনি মেহেরপুর পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি মানুষের কল্যাণে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। তাঁর নেতৃত্ব, সততা ও মানবিক আচরণ তাঁকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
তিনি একজন ক্রীড়া সংগঠক ও জনপ্রিয় ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি কলকাতা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে কলকাতা এরিয়ান ক্লাবের একজন খেলোয়াড় ছিলেন। নদীয়া জেলা ফুটবল দলে তিনি দীর্ঘদিন খেলেছেন।
তিনি মেহেরপুর মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৪ সালে মেহেরপুর পাবলিক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক রুহুল কুদ্দুস সিএসপি মেহেরপুর পাবলিক লাইব্রেরী চত্বরে টেনিস মাঠ নির্মাণ করেন। ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি মেহেরপুর মহকুমা ও পরে জেলা পূজা কমিটির সভাপতি ছিলেন। মেহেরপুর টাউন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
একজন সংবেদনশীল কবি
আইনজীবী ও সমাজসেবকের পাশাপাশি প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন একজন হৃদয়বান কবি। তাঁর কবিতায় জীবন, মৃত্যু, মানবতা ও দর্শনের গভীর উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর সমাধিফলকে উৎকীর্ণ বিখ্যাত কবিতা ‘গঙ্গা’-র কয়েকটি পঙ্ক্তি আজও দর্শনার্থীদের হৃদয় স্পর্শ করে—
“আমার মৃত্যুর পর যদি কেউ কোনদিন এসে
খোঁজে মোর নাম,
হে মহাশ্মশান, বলে দিও তারে
তোমার মাটির সাথে মিশে গেছে
চিতা ভস্ম মোর।
অনিত্য এ জীবনের
কিবা আছে দাম।”
এই কবিতায় জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও মানুষের বিনম্র আত্মসমর্পণের এক অনন্য দর্শন ফুটে উঠেছে।
পারিবারিক উত্তরাধিকার
প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্যের সহধর্মিণী ছিলেন প্রয়াত নীরা ভট্টাচার্য। তিনি ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন।
তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র অ্যাডভোকেট পল্লব ভট্টাচার্য মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এবং মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে বিচারপ্রার্থীদের সেবা দিয়ে আসছেন।
দ্বিতীয় পুত্র প্রলয় ভট্টাচার্য তন্ময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশনের (BHBFC) আইন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্যের ভাইদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন প্রয়াত অ্যাডভোকেট কার্তিক ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষক ননীগোপাল ভট্টাচার্য এবং মুক্তিযোদ্ধা প্রশান্ত ভট্টাচার্য।
শতবর্ষের আইন ঐতিহ্য
ভট্টাচার্য পরিবারের আইন পেশার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ‘ল-গার্ডেন’-এ শতবর্ষ উদযাপন করা হয়। মেহেরপুরে একই পরিবারের ধারাবাহিকভাবে শত বছর ধরে আইন পেশায় যুক্ত থাকার এই ঐতিহ্য জেলার ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত।
স্মরণীয় উত্তরাধিকার
অ্যাডভোকেট প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি আইনকে পেশা হিসেবে নয়, সমাজসেবার একটি মহান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। একজন দক্ষ আইনজীবী, প্রজ্ঞাবান সংগঠক, সংস্কৃতিমনা মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক এবং মানবিক কবি হিসেবে তিনি মেহেরপুরের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর জীবন, কর্ম ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের জন্য ন্যায়, মানবতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল প্রেরণা।
সূত্র – গ্রেটার কুষ্টিয়া নিউজ




