বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নাটকীয়তার আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দিল মরক্কো। হারের মুখ থেকে ফিরে এসে অতিরিক্ত সময় পেরিয়ে টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছে উত্তর আফ্রিকার দেশটি।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) এস্তাদিও মন্টেরিতে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর এই লড়াইয়ে ১২০ মিনিট শেষে স্কোর ছিল ১-১। পরে পেনাল্টি শুটআউটে গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর অসাধারণ নৈপুণ্যে শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত করে মরক্কো। আগামী ৪ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে কানাডার মুখোমুখি হবে তারা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে ছিল মরক্কোর আধিপত্য। ডান প্রান্তে আশরাফ হাকিমি ও নুসাইর মাজরাউইয়ের গতিময় ফুটবল বারবার চাপে ফেলে ডাচ রক্ষণকে। ৬ মিনিটেই হাকিমির বিপজ্জনক ক্রস অল্পের জন্য সতীর্থদের নাগালের বাইরে চলে যায়। এরপর ইসমাইল সাইবারি, আজেদিন উনাহি ও বিলাল এল খানুসের সমন্বয়ে একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
১৯ মিনিটে ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগ তৈরি করে মরক্কো। হাকিমির কর্নার থেকে এল আইনাউইয়ের কাছ থেকে আসা হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন নেদারল্যান্ডসের গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেন। দুই মিনিট পর আবারও তিনি দলের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন।
এল খানুসের পাস থেকে বল পেয়ে সাইবারি ডান দিকে হাকিমিকে খুঁজে দেন। মরক্কোর অধিনায়কের শক্তিশালী শট নিকট পোস্টে দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ভারব্রুগেন।
প্রথমার্ধজুড়েই বলের দখল ও সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিল মরক্কো। অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণে ভরসা রেখেছিল নেদারল্যান্ডস। ৪৪ মিনিটে ক্রিসেনসিও সামারভিলের পাস থেকে মিকি ভ্যান ডি ভেনের জোরাল শট অসাধারণভাবে ঠেকিয়ে দেন ইয়াসিন বুনু।
যোগ করা সময়ে উনাহির শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর হাকিমির নিচু ক্রস থেকে প্রায় খালি জাল পেয়েও বল জালে জড়াতে পারেননি সাইবারি। ফলে গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণাত্মক ছিল মরক্কো। ৫২ মিনিটে উনাহির নিখুঁত পাস থেকে হাকিমির শক্তিশালী শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এরপর ম্যাচের গতি বদলাতে একের পর এক পরিবর্তন আনেন ডাচ কোচ রোনাল্ড কোমান। ৭১ মিনিটে ওয়াউট ওয়েগহর্স্টকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত দ্রুতই ফল দেয়।
৭২ মিনিটে ভারব্রুগেনের দীর্ঘ গোলকিক থেকে ওয়েগহর্স্ট হেড করে বল নামিয়ে দেন। সামারভিল বল নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে পড়ে গেলেও বল চলে যায় কোডি গাকপোর সামনে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে বুনুকে পরাস্ত করে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন লিভারপুল ফরোয়ার্ড।
গোলের পর রক্ষণ শক্ত করে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে ডাচরা। তবে মরক্কোর কোচ একের পর এক আক্রমণভাগে পরিবর্তন আনেন। শেষ দিকে মাঠে নামানো কেমসদিন তালবিই বদলে দেন ম্যাচের চিত্র।
যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে বাম দিক থেকে তালবির দারুণ এক ক্রসে ইসা দিওপ শক্তিশালী হেডে বল জালে জড়ান। মুহূর্তেই ১-১ সমতায় ফেরে মরক্কো। নিশ্চিত জয় ভেবে বসে থাকা নেদারল্যান্ডস তখন হতাশায় ডুবে যায়। শেষ মুহূর্তে আর কোনো দল গোল করতে না পারায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ভাগে বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল অনেকটাই মরক্কোর হাতে। ৯৮তম মিনিটে সাইবারির পাস থেকে সুফিয়ান রহিমি নিশ্চিত গোলের সুযোগ পেলেও বার্ট ভারব্রুগেন অবিশ্বাস্য এক সেভ করে নেদারল্যান্ডসকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি ডাচরা।
দ্বিতীয় অতিরিক্তার্ধেও দুই দলই মরিয়া চেষ্টা চালায়। ১১১তম মিনিটে তালবির ক্রস থেকে রহিমির দিকে যাওয়া বল শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত ভলিতে ক্লিয়ার করেন টেউন কুপমেইনার্স। পরে ভাউট ওয়েগহর্স্টের হেড থেকে গোলের সম্ভাবনাও নষ্ট হয়। শেষ দিকে চোটে মাঠ ছাড়েন কোডি গাকপো। অন্যদিকে চোখে আঘাত পেয়ে সাময়িক সময়ের জন্য মাঠের বাইরে যেতে হয়েছিল ইসমাইল সাইবারিকে। সব মিলিয়ে ১২০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ১-১-ই থাকে।
ম্যাচের নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। শুরুটা ভালো করে নেদারল্যান্ডস। টিউন কুপমেইনার্স প্রথম শট থেকেই গোল করেন। মরক্কোর হয়ে নিল এল আইনাউইয়ের শট গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও ক্রসবারে লেগে বাইরে চলে যায়।
তবে এরপর ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। জাস্টিন ক্লুইভার্টের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। মরক্কোর হয়ে সুফিয়ান রহিমি সফলভাবে গোল করে সমতা ফেরান। ভাউট ওয়েগহর্স্ট গোল করলেও শেমসদিন তালবি আবারও ব্যবধান সমান করেন।
শেষ দিকে নেদারল্যান্ডসের কুইন্টেন টিম্বারের শট বাইরে চলে গেলে সুযোগ পায় মরক্কো। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি নিজের শট পোস্টে মারেন। তবে শেষ শটে ইসমাইল সাইবারি সফল হন। এরপর নেদারল্যান্ডসের হয়ে শেষ পেনাল্টি নিতে আসেন ক্রাইসেনসিও সামারভিল। কিন্তু ইয়াসিন বুনু দুর্দান্ত সেভ করলে ৩-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে উল্লাসে ফেটে পড়ে মরক্কো।




