আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভিনিউজ : আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী কয়েকটি প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলা ও স্থল অভিযানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তালেবান সরকার দাবি করেছে, রোববার (২৮ জুন) পাকিস্তানের চালানো হামলায় বেসামরিক নাগরিকসহ অন্তত ১০০ জন নিহত বা আহত হয়েছেন। তবে পাকিস্তান বলছে, অভিযানে ২৯ জন সশস্ত্র জঙ্গি নিহত হয়েছে এবং এটি সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার জবাবে পরিচালিত একটি লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান।
তালেবান সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে হামলা চালানোর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় স্থলসেনাও মোতায়েন করেছে। হামলায় বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কাবুল। তালেবান সরকার এ ঘটনাকে “কাপুরুষোচিত কাজ”, “অপরাধ” ও “নৃশংসতা” হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, হামলার লক্ষ্য ছিল সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি। তার ভাষ্য, নিরীহ মানুষের ওপর সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, অভিযানে ২৯ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালাচ্ছে। তবে তালেবান সরকার বরাবরই এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা কোনো বিদেশি গোষ্ঠীকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয় না।
সাম্প্রতিক হামলায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। তালেবানের দাবি, বেসামরিক নাগরিকসহ অন্তত ১০০ জন নিহত বা আহত হয়েছেন। তবে পাকিস্তান কেবল জঙ্গি নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। স্বাধীনভাবে এসব দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তালেবান কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পাকতিকা প্রদেশের মানদিখেল গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এই হামলার আগে গত অক্টোবর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু আগের মতো সেই সমঝোতাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর থেকে সীমান্ত এলাকায় থেমে থেমে গোলাগুলি, বিমান হামলা ও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
রোববারের অভিযানের পেছনে করাচিতে পাকিস্তানি আধাসামরিক বাহিনী সিন্ধু রেঞ্জার্সের সদস্যদের ওপর আত্মঘাতী হামলার ঘটনাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, ওই হামলায় তিন রেঞ্জার্স সদস্য নিহত হন। হামলায় অংশ নেওয়া তিন হামলাকারীও নিহত হয় এবং একজন আফগান নাগরিককে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নিষিদ্ধ ঘোষিত টিটিপির একটি বিভক্ত অংশ জামাত-উল-আহরার ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
গত কয়েক মাস ধরেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকায় পাকিস্তানের হামলায় বহু মানুষ নিহত হওয়ার দাবি করে তালেবান। তখনও উভয় পক্ষ একে অপরকে আগে হামলা চালানোর জন্য দায়ী করেছিল। পরে মার্চ মাসে কাবুলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ তোলে তালেবান সরকার। তবে পাকিস্তান সে অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তারা কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি।
এ ছাড়া জুন মাসেও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে ২৬ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করে। কিন্তু তালেবান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১৩ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ না বাড়ালে সীমান্ত অঞ্চলে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




