বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ ডেস্ক : আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি মরুভূমি থেকে উদ্ধার হওয়া একটি পাথরখণ্ড এখন বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা গেছে, এটি পৃথিবীর নয়; এসেছে চাঁদ থেকে। কোটি কোটি বছর আগে চাঁদে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ মহাজাগতিক সংঘর্ষের সাক্ষী হয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল এই পাথরটি। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু চাঁদের ইতিহাস নয়, পৃথিবীতে প্রাণের শুরুর সময়কার পরিবেশ সম্পর্কেও নতুন তথ্য দিতে পারে।
উদ্ধার হওয়া এই চন্দ্রখণ্ডটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘নর্থওয়েস্ট আফ্রিকা ১২৫৯৩’ বা সংক্ষেপে ‘এনডব্লিউএ ১২৫৯৩’। গবেষকদের দাবি, পাথরটির মধ্যে চাঁদে সংঘটিত অন্তত তিনটি বড় আঘাত বা সংঘর্ষের চিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি সংঘর্ষ ছিল এতটাই শক্তিশালী যে চাঁদের পৃষ্ঠের বিস্তীর্ণ অংশ গলে গিয়েছিল এবং গলিত শিলা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগে এই সংঘর্ষ ঘটেছিল। সেই সময় পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের প্রাথমিক ধাপ চলছিল। অর্থাৎ পৃথিবীতে জীবনের সূচনা যে যুগে, সেই সময়কার মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে এই পাথরখণ্ড।
পৃথিবীতে এত পুরোনো শিলা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ পৃথিবীর ভূত্বক ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, ক্ষয়প্রক্রিয়া এবং টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে প্রাচীন শিলাগুলো ধ্বংস হয়ে যায় বা নতুন শিলার নিচে চাপা পড়ে। কিন্তু চাঁদে এ ধরনের পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে খুব কম হয়েছে। ফলে চাঁদ এক ধরনের প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগারে পরিণত হয়েছে, যেখানে সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাস এখনও সংরক্ষিত রয়েছে।
এই কারণেই চাঁদ থেকে আসা প্রতিটি পাথর বিজ্ঞানীদের কাছে অমূল্য সম্পদ। আফ্রিকার মরুভূমিতে পাওয়া এই চন্দ্রখণ্ডটিও সেই মূল্যবান সম্পদের অন্যতম বলে মনে করা হচ্ছে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী ক্যারোলিন ক্রো। তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষক দল পাথরটির রাসায়নিক গঠন ও বয়স বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জিয়োলজি’-তে।
গবেষকদের মতে, প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগে চাঁদে বিশাল এক মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে এই পাথরখণ্ড ছিটকে বেরিয়ে আসে। পরে দীর্ঘ সময় মহাকাশে ভেসে থাকার পর সেটি পৃথিবীতে এসে পড়ে। আফ্রিকার মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত ছিল এই টুকরোটি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে এই গবেষণায়। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, প্রায় একই সময়ে পৃথিবী এবং গ্রহাণুপুঞ্জের দ্বিতীয় বৃহত্তম বস্তু ভেস্টায় বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছিল। তবে নতুন গবেষণা বলছে, একই সময় চাঁদেও একটি শক্তিশালী আঘাত নেমে এসেছিল। অর্থাৎ সৌরজগতের সেই সময়টা ছিল অত্যন্ত অস্থির ও সংঘর্ষপূর্ণ।
পাথরটির বয়স নির্ধারণে গবেষকরা ব্যবহার করেছেন ‘রেডিওমেট্রিক ডেটিং’ নামের একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয়ের হার বিশ্লেষণ করে কোনো বস্তুর বয়স নির্ণয় করা হয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে পাথরটির ইতিহাস কয়েকশ কোটি বছরের পুরোনো।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী এবং চাঁদের ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বহুল প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবী সৃষ্টির কিছু সময় পর একটি বিশাল মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষে পৃথিবীর একাংশ ছিটকে মহাকাশে চলে যায়। সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই পরবর্তীতে চাঁদের সৃষ্টি হয়। ফলে চাঁদের শিলার মধ্যে পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসেরও অনেক তথ্য লুকিয়ে থাকতে পারে।
গবেষণার অন্যতম নেতা ক্যারোলিন ক্রো বলেছেন, পৃথিবীতে প্রাণের সবচেয়ে পুরোনো জীবাশ্মের বয়স প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি বছর। এর অর্থ হলো, প্রাণের উৎপত্তি তারও আগে হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় পৃথিবীর পরিবেশ কেমন ছিল, তা এখনও অনেকটাই অজানা। চাঁদের এই পাথরখণ্ড সেই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, সৌরজগত গঠনের প্রায় একশ কোটি বছর পরও গ্রহ ও উপগ্রহগুলোর চারপাশে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিল। ফলে তখন প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটত। সেই অস্থির সময়েরই এক নীরব সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে আফ্রিকার মরুভূমিতে পাওয়া এই চাঁদের টুকরো।
গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও আবিষ্কার সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাস, পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং চাঁদের বিবর্তন সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ কর




