বিশেষ প্রতিবেদন :
ভিনিউজ : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ফলে দেশজুড়ে ভয়াবহ কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে তাদের চাকরি হারিয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেশটির উপ-শ্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রী গোলামহোসেইন মোহাম্মাদি।
এই ব্যাপক ছাঁটাই এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই শহরের ফাঁকা মেট্রো, কমে যাওয়া যানজট এবং অফিস এলাকায় খালি পার্কিংয়ের চিত্র তুলে ধরে কর্মসংস্থানের এই ধসের বাস্তবতা তুলে ধরছেন। তবে সরকার ও নিয়োগদাতারা ‘ছাঁটাই’ শব্দটি এড়িয়ে ‘কর্মী ভারসাম্য’ আনার কথা বলছেন।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন খাত, খুচরা ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, এমনকি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। মানুষের ভোগব্যয় কমে যাওয়ায় পর্যটন, রেস্তোরাঁ ও খুচরা ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ রাখায় ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে ডিজিটাল খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রায় ৫০ ট্রিলিয়ন রিয়াল (প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার) ক্ষতি হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর ৫২ দিনে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
নারীরা এ সংকটে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যুদ্ধের আগেই কর্মক্ষম নারীদের অংশগ্রহণ ছিল কম, আর এখন অনেক নারী যারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা করতেন, তারা আয় হারিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। তথ্যের চাহিদা বাড়লেও কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। একটি সংবাদ সংস্থা তাদের সব সাংবাদিককে ছাঁটাই করে ফ্রিল্যান্স হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প স্থাপনাগুলোতে হামলার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। পেট্রোকেমিক্যাল ও স্টিল খাতে বড় ক্ষতির ফলে সরাসরি হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য খাতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
দেশটির বৃহৎ গাড়ি শিল্প, যেখানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কাজ করেন, সেখানেও সরবরাহ সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ছাঁটাই বাড়ছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে, ফলে অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় নিয়োগের আশ্বাস দিলেও বর্তমানে অনেক কর্মী বেতনহীন ছুটিতে রয়েছেন। সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ঋণ সুবিধা চালু করলেও উচ্চ সুদের কারণে তা অনেকের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে এই বেকারত্ব সংকট এমন সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে ইরানের অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে, আর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।




