এনআরসি বিজেপির জন্য বুমেরাং!

এ যেন আসামে কথিত অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে কথিত ভূমিপুত্রের বিরোধ। ভোটের সমীকরণ, চাকরি-বাকরি, সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আসামে নিজের লোকদের অনেককেই ‘বিদেশি’ তকমা দিয়ে কখনো বলা হয়েছে এ সংখ্যা এক কোটি, আবার কখনো বা ৩০ লাখ, ৫০ লাখ অথবা ৮০ লাখ। অবশেষে গতকাল শনিবার আসামে প্রকাশিত নাগরিক তালিকায় (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স, সংক্ষেপে এনআরসি) ১৯ লাখ ছয় হাজার ৬৫৭ জন বাদ পড়েছে। তালিকায় নাম উঠেছে তিন কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বাদ পড়া লোকদের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাঙালি, ছয় লাখ মুসলমান। বাকি দুই লাখের মধ্যে আছে বিহারি, নেপালি ও লেপচা। এই হিসাবটি আসামে ক্ষমতাসীন বিজেপি বা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ধারণারও বাইরে। যারা এত দিন কথিত বিদেশিদের তাড়ানোর মিশন নিয়ে এনআরসির পক্ষে সাফাই গেয়েছে তারাই গতকাল এনআরসির সমালোচনা করেছে।

এনআরসির ফল যে মনঃপূত হয়নি তা আসাম রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্যেই স্পষ্ট। গতকাল দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এনআরসি আসামের বিদেশি সমস্যা দূর করবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ১৯৭১ সালের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসামে গেছেন এমন অনেকের নাম এনআরসিতে বাদ পড়েছে। কারণ তাদের শরণার্থী সনদ এনআরসি কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। আবার অনেকের নাম জালিয়াতির মাধ্যমে ঢুকেছে বলে দাবি করে তিনি ‘সঠিক এনআরসির’ জন্য সীমান্ত এলাকায় ২০ শতাংশ এবং বাকি এলাকায় ১০ শতাংশ লোকের নাগরিকত্ব পুনরায় যাচাই করার দাবি জানান।

আসামে বিজেপির বিধায়ক শিলাদিত্য দেব গতকাল বলেছেন, এনআরসি আসাম থেকে হিন্দুদের বিতাড়নের ষড়যন্ত্র।

এনআরসির ফল প্রকাশের পর বিজেপি ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনবে। এনআরসির পক্ষের লোকজনের এত দিন ধারণা ছিল, আসামে কথিত বিদেশিদের বড় অংশই বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান। এ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অনেকেই ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে ফল হলো উল্টো। বাদ পড়া ব্যক্তিদের অনেকেই বিজেপির ভোটার হিসেবেও পরিচিত।

ভারতের বিশ্লেষকরাই বলছেন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে ‘নিপীড়িত’ হিন্দুদের আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া মোদি সরকার এখন এনআরসির বাইরে থাকা বিশাল হিন্দু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে কী উদ্যোগ নেয় এবং আসামসহ ভারতের রাজনীতিতে এর কী প্রভাব পড়ে সেদিকে দৃষ্টি থাকবে সবার।

ভারতীয় বাংলা দৈনিক যুগশঙ্খর গুয়াহাটি সংস্করণে গতকাল প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘আজ শাপমুক্তির প্রতীক্ষায় ৪১ লাখ’। এর আগে প্রকাশিত তালিকায় বাদ পড়া ৪১ লাখ বাসিন্দার ভাগ্য পরীক্ষা ছিল গতকাল। অন্তত ২২ লাখ বাসিন্দা ‘বিদেশি’ সন্দেহের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেল।

গত এপ্রিল-মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ইশতেহারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ, এনআরসিতে অগ্রাধিকার এবং অন্যান্য রাজ্যেও সম্প্রসারণের। বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব বেশ আগেই কথিত অবৈধ বাসিন্দাদের ব্যাপারে ইংরেজিতে ‘থ্রি ডি’—‘ডিটেক্ট’ (চিহ্নিতকরণ), ‘ডিলিট’ (বাদ দেওয়া) ও ‘ডিপোর্ট’ (বহিষ্কার) করার নীতির কথা বলেছিলেন।

তবে বাংলাদেশ বরাবরই আসামের এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করে আসছে। ভারতীয় কূটনীতিকরাও এনআরসিকে তাঁদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর সাংবাদিকদের বলেন, এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

কূটনীতিকরা আগেই আভাস দিয়েছেন, নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে পরের বক্তব্যের মিল থাকে না। নরেন্দ্র মোদিও আগে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর এই ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য ও উদ্যোগ ছিল সংযত ও দায়িত্বশীল।

ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আদালতের নির্দেশে এনআরসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। যারা বাদ পড়বে তারা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নাগরিক তালিকায় নাম উঠানোর সুযোগ পাবে। যেহেতু পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে আদালত জড়িত তাই শেষ পর্যন্ত নাগরিক তালিকায় নাম উঠানো ব্যক্তিদের ব্যাপারেও আদালত নির্দেশনা দিতে পারে।

জানা গেছে, এনআরসিতে বাদ পড়া লোকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলেও উদ্বেগ আছে। ভারতীয় কংগ্রেসের নেত্রী সুস্মিতা দেব গতকাল এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘১১ লাখেরও বেশি লোক আসামে এনআরসিতে বাদ পড়েছেন। এটি মানবাধিকারের বিষয়। প্রকৃত নাগরিকরাও বাদ পড়েছেন। এমনকি যদি তাঁরা নাগরিক না-ও হয়ে থাকেন, তাঁরা তো মানুষ। সামনে তাঁদের কঠিন আইনি লড়াই। তাঁদের ব্যাপারে ভারতকে সমাধান বের করতে হবে। লাখ লাখ লোককে ভারত এভাবে রাষ্ট্রহীন করে রাখতে পারে না।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে আসামে এনআরসি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্করের ঢাকা সফরে তিনি এনআরসি নিয়ে প্রশ্ন করে বলেছিলেন যে এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের অনেকেই উদ্বিগ্ন। এরপর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনেও স্পষ্টভাবে বলেছেন, এনআরসি পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ বিষয়।

ড. মোমেন বলেন, এনআরসির ফলে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হবে না বলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

ড. মোমেন আরো বলেন, বাংলাদেশ ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নিয়েই সমস্যায় আছে বলে ড. জয়শঙ্করকে জানিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জয়শঙ্কর যে কথা বলেছেন তাতে তিনি আস্থা রাখেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। পড়াশোনা জানে না এমন লোকেরও কাজের অভাব নেই। সুতরাং আমাদের লোক অন্য দেশে যাবে এটি আমরা বিশ্বাস করি না। আমাদের লোক যদি কেউ গিয়ে থাকে সেটি বহু আগে, ১৯৭১ সালেরও আগে।’

এনআরসি বিজেপির জন্য বুমেরাং : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতীয় একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আসামে এনআরসিতে বাদ পড়া লোকজন বাংলাদেশি—এমনটি বাংলাদেশ বিশ্বাস করে না। গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী আমান ওয়াদুদ দীর্ঘ দিন ধরে নাগরিকত্বসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো লড়ছেন। তিনি গতকাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এনআরসির চূড়ান্ত তালিকাকে ‘ফেক নিউজের’ (ভুয়া খবর) বিরুদ্ধে ঝড় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কেউ বলছিলেন, ৪০ লাখ, ৫০ লাখ, ৮০ লাখ অবৈধ বাসিন্দা। এগুলো ছিল প্রপাগান্ডারই অংশ। বলা হচ্ছিল, আসাম ‘বাংলাদেশি’তে ভরে গেছে। আমার মনে হয়, যত প্রপাগান্ডা ছিল তার সবগুলোকেই ধ্বংস করে দিয়েছে এনআরসি।”

অসমিয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো এনআরসি প্রকাশের পর যথেষ্ট ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আশির দশকে আসাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (আসু) সঙ্গে ভারত সরকারের চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতেই এনআরএসি হালনাগাদ করা হয়েছে। আসুর নেতা লুরিন জ্যোতি গগৈ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তাঁরা বারবার বলছিলেন এনআরসি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি আছে। তাঁরা এর বিরুদ্ধে আদালতে যাবেন। আসামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাজীব ভট্টাচার্য বলেন, সবার ধারণা ছিল বিপুলসংখ্যক অবৈধ ‘বাংলাদেশি’ আছে আসামে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এনআরসির যে ফল বেরিয়েছে তা অনেকেই মানতে পারছে না।

এনআরসি হালনাগাদ শুরু করতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন আসাম পাবলিক ওয়ার্কস নামে একটি সংগঠনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। এনআরসির এমন ফলের পর আসাম পাবলিক ওয়ার্কসের নেতা অভিজিৎ শর্মা গতকাল টেলিভিশনে হাতজোড় করে আসামবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, এত কিছু করেও ফল শূন্য।