কম ডেঙ্গু রোগী নিয়েও মৃত্যু বেশি প্রাইভেটে

ঢাকার ১১টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে মোট ১৮ হাজার ৩৭০ জন। আর ঢাকার ৩৫টি বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ১৫৪ জন। এর মধ্যে সরকারি কমিটির পর্যালোচনায় থাকা মৃত ৭০ জনের মধ্যে যে ৪০ জনের ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করা গেছে, তাদের ৩৩ জনেরই (৮২ শতাংশ) মৃত্যু হয়েছে বেসরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে। অন্য সাতজনের মৃত্যু হয়েছে সরকারি হাসপাতালে। এর বাইরে বেসরকারিভাবে হাসপাতালভিত্তিক সূত্র অনুসারে আরো যে ৫০ জনের বেশি রোগীর মৃত্যুর তথ্য রয়েছে তাদের মধ্যেও ৩০ জনের বেশি ছিল বেসরকারি বা প্রাইভেট হাসপাতালের রোগী।

এদিকে প্রাইভেটে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক হাসপাতাল থেকেই ডেঙ্গুর জটিল রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার খবর আসছে প্রতিদিনই।

এমনকি প্রাইভেট এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতেই রোগীর মারা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা প্রাইভেট হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার মানগত অবস্থা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছেন। এবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরুর পরপরই এ বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বহীনতার অভিযোগ করছে অনেকেই।

অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ থোক অর্থ বরাদ্দ, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরও কোনো কোনো সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিনই। রবিবার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে মারা যাওয়া এক রোগীকে আগে আরো দুটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।

যদিও ঢাকার বাইরে আবার বেশির ভাগেরই মৃত্যু ঘটছে সরকারি হাসপাতালে। তবে এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালে মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেনি জাতীয় পর্যায়ের মৃত্যু বিশ্লেষণ কমিটি। তবে বেসরকারি পর্যালোচনায় ওই সংখ্যাও ঢাকার প্রাইভেট হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গঠিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আমরা দু-এক দিনের মধ্যেই ব্যাপারটি দেখার চেষ্টা করব।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সব বেসরকারি হাসপাতাল এক মানের নয়। আবার প্রাইভেট সব হাসপাতালই ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার প্রটোকল ঠিকভাবে মানছে না। কোনো হাসপাতালের টার্গেটই থাকে রোগীকে কিভাবে আইসিইউতে পাঠানো যায় সেদিকে। কিন্তু আইসিইউতে নেওয়ার পর যে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার সেটা হয় না। কোথাও কোথাও দক্ষ চিকিৎসকেরও অভাবে রয়েছে। যাঁরা দায়িত্ব পালন করে তাঁদের অনেকে হয়তো সময়মতো ঠিক করণীয় বুঝতেই পারেন না। এ কারণেই সরকারি হাসপাতালের চেয়ে তুলনামূলক কম রোগী থাকা সত্ত্বেও প্রাইভেটে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশি রোগীর মৃত্যু ঘটছে। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, এ ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো কোনো হাসপাতালে অন্য কোনো জটিলতার সঙ্গে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কোনো রোগী মারা গেলেও তাকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বলেই দেখানো হয়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তথ্য দিয়ে বলেন, ‘আমাদের গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ৩০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল, এর মধ্যে দুজন মারা গেছে। তাদের একজন কিডনি বিকল হওয়া রোগী ছিলেন, সেই সঙ্গে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দেখেছি, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত থাকলেও তাঁর মৃত্যুর প্রধানতম কারণ কিডনি বিকল হওয়া। আরেকজন ডেঙ্গু শক সিনড্রমেই মারা গেছেন।’

এদিকে গত কয়েক দিনে বেশ কিছু মৃত রোগীর আগের চিকিৎসা পরিস্থিতির খোঁজ করে জানা গেছে, ‘অনেককেই প্রথমে যে হাসপাতালে নেওয়া হয় চিকিৎসার জন্য, সেখানে সিট সংকট বা অন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে তাকে না রাখায় পরে একাধিক হাসপাতাল ঘুরে সর্বশেষ যে হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পায় সেখানে তার মৃত্যু ঘটে। কোনো কোনো সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা ধরতে না পেরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি ঘটে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটেছে বলেও নজির রয়েছে।

এমনকি মাদারীপুরের সরকারি স্বাস্থ্য সহকারী তপন কুমার ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক কাজে ঢাকার এসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথমে ঢাকা মেডিক্যালে গেলে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। বাড়িতে যাওয়ার পর তিনি সেখানে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে মাদারীপুর হাসপাতাল, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হয়ে ঢাকার বেসরকারি বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে মারা যান। এর আগে ঢাকায় দুজন চিকিৎসকের মৃত্যু ঘটেছে দুই বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে। আরো তিন শিশুর মৃত্যুর আগেও একইভাবে ঘুরতে হয়েছে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকদের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আরো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ সাধারণত দ্রুত চিকিৎসার আশায় অনেকেই জটিল রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই হাসপাতালে ওই রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়ার মতো দক্ষতাসম্পন্ন চিকিৎসক থাকেন কি না কিংবা সেই ব্যবস্থাপনাও থাকে কি না সেটা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সংশয় জাগতে পারে।

সরকারিভাবে ডেঙ্গুতে মৃত্যু তথ্য বিশ্লেষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের পুরো পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণপ্রক্রিয়া শেষ না করা পর্যন্ত এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো মতামত দেওয়া যাবে না। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এ পর্যন্ত আমরা যতগুলো সংখ্যা নিশ্চিত করেছি তাদের বেশির ভাগই প্রাইভেটে মারা গেছে। তাই আমাদের পর্যালোচনার ভেতরে এ বিষয়টিও দেখা হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার লাইন ডাইরেক্টর ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, ‘এটা সত্যি যে সাধারণত ক্রিটিক্যাল রোগীরাই প্রাইভেটে ছুটে যায়। সে জন্য মৃত্যুও হয়তো সেখানে বেশি হতে পারে। কিন্তু আমরা আমাদের মনিটরিং টিমের মাধ্যমে দেখব জটিল ডেঙ্গু রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কোনো ঘাটতি আছে কি না। কাল (আজ) থেকেই আমরা এ জন্য কাজ শুরু করব।’

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১৬১৫ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা জানান, গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৬১৫ জন, যা আগের দিন ছিল এক হাজার ৭০৬ জন। এই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে দুই হাজার ৫০ জন। এর মধ্যে রবিবার সকাল ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় নতুন ভর্তি হয়েছে ৭৫৭ জন, ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি হয়েছে ৮৫৮ জন। গতকাল সকালে সারা দেশে নতুন ও পুরনো মিলে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ৭৩৩ জন, যা আগের দিন ছিল সাত হাজার ১৬৮ জন।

হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে জানান, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২২ জন, যা আগের দিন ছিল ৯৭ জন; মিটফোর্ড হাসপাতালে ৮১ জন, যা আগের দিনে ছিল ৯৩ জন; মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৩ জন, যা আগের দিন ছিল ৬১ জন; শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৫ জন, আগের দিন যা ছিল ৫২ জন। গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর সংখ্যা ৫৪ হাজার ৭৯৭ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৮ হাজার ২৪ জন।

আরো ছয়জনের মৃত্যু : এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে সামিয়া আক্তার (৩২) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু ঘটেছে। সামিয়া তাঁর স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর শ্যামলীতে বসবাস করতেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, ১০ আগস্ট সামিয়া ঢাকা থেকে ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতে গেলে জ্বরে আক্রান্ত হন। তাঁকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু বেড না পাওয়ায় স্বজনরা তাঁকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, রবিবার রাতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাসেল মিয়া (৩৪) ও আনোয়ার হোসেন (৪০) নামের দুজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ঘটেছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে গতকাল সকাল ১০টায় ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেলোয়ার হোসেন (৩৫) নামের এক রোগীর মৃত্যু ঘটেছে বলে জানিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র ফরিদপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার ফাতেমা আক্তার (২১) ও খুলনার রূপসা উপজেলার খাঁজাডাঙ্গা গ্রামের সবজি বিক্রেতা মিজানুর রহমান (৪০) মারা গেছেন।