অমাবস্যার সন্ধ্যা

 

তোয়াব খান

পনেরোই আগস্টের সকালে জাতিদ্রোহী দানবদের ঘোষণায় গোটা দেশ কার্যত স্তম্ভিত বিমূঢ় হয়ে পড়ে। প্রথমেই বেতারে জাতির জনকের হত্যার ঘোষণাকে অনেকেই উন্মাদের প্রকাশ হিসেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভ্রান্তি নিরসনের সময় দীর্ঘ হয়নি। গোলাগুলি আর মর্টার শেল বিস্ফোরণের আওয়াজে ইবলিশের ঘোষণাই যেন জাতির স্কন্ধে চেপে বসে। একের পর এক হত্যার খবরে স্থবিরতাই যেন গ্রাস করে।

কলঙ্কিত এ দিনে সকালের প্রাত্যহিকতা একটু আগেভাগে শুরু করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। রাতেই আমাকে জানিয়েছিলেন, সকাল সকাল এসে বক্তৃতার মূল পয়েন্টগুলো বড় বড় হরফে লিখে যেন তাঁকে দিয়ে যাই। আমি তখন বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে যাওয়ার জন্য প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু বাংলাদেশ বেতারে দানবীয় ঘোষণার পর বাড়িতে কান্নার রোল। সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য লাল টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকি। সরকারের ও রাষ্ট্রের প্রধান, মন্ত্রী, সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অফিস ও বাসায় এই লাল টেলিফোন দেওয়া হয় সরাসরি যোগাযোগের জন্য।

প্রথমেই টেলিফোন করলাম রাষ্ট্রপতি তথা বঙ্গবন্ধুর সচিব আবদুর রহিম সাহেবকে। আবদুর রহিম পুলিশ সার্ভিসের সিনিয়র মোস্ট অফিসারদের অন্যতম। পুলিশ সার্ভিসে সুনামের অধিকারী খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হলেও আবদুল খালেক, আবদুর রহিমের মতো ব্যক্তিত্বের কথা শোনা যায়। আবদুল খালেক, খালেক ভাই হিসেবে আমাদের অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন। খালেক ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে পুলিশ প্রধান ও স্বরাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। আবদুর রহিম মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন না। পাকিস্তানিদের কাউন্টার টেররিজম বাহিনী গঠনে যাঁদের মতামত, সুপারিশ ইত্যাদি গ্রাহ্য করা হতো, রহিম সাহেবকেও অনুরূপ এক ব্যক্তি হিসেবে কেউ কেউ উল্লেখ করতেন। তবে বঙ্গবন্ধুকে কোনো সময়েই আবদুর রহিম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে শুনিনি।

যাই হোক, রহিম সাহেবকে টেলিফোন করে জানতে চাইলাম, রেডিওর ঘোষণা তিনি শুনেছেন কি না। এ বিষয়ে তিনি কিছু অবহিত কি না। রহিম সাহেবের জবাবটি খুবই নিরাসক্ত। বললেন, তিনিও রেডিওতে ঘোষণা শুনেছেন। জবাবে বিরক্তি ও বক্রোক্তি সুস্পষ্ট। ঘণ্টাখানেক পরে আরো একবার টেলিফোন করাতে অনেক কিছুই স্পষ্ট হলো। বললেন, এ নিয়ে, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে বারবার টেলিফোন করবেন না।

দ্বিতীয় টেলিফোনটি করলাম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ফরাসউদ্দিনকে। ফরাস জানালেন, কিছু সেনা বিদ্রোহের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাঁদের দমন করা হয়েছে। কর্নেল ডালিম নিজে সৈনিক নিয়ে গেছেন। উদ্দেশ্য বিদ্রোহ দমন। ফরাস জানালেন, তিনি নিজে বত্রিশ নম্বরে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে দেশের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা, অর্থাৎ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) প্রধান (ডাইরেক্টর জেনারেল) মেজবাউদ্দিন আহমদকে ফোন করলাম। উদ্দেশ্য একটাই, সত্যাসত্য যাচাই করে নিজ কর্তব্য নির্ধারণ। মেজবাউদ্দিন সাহেব আমাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। অন্য সকলের মতোই তিনিও রেডিও ঘোষণা শুনেছেন এবং সব কিছুই তো ওদের ঘোষণা অনুযায়ী ঘটছে।

পুলিশের আরো এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু সরকারের একটি উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। নাম এ বি এম সাকদার। ছিলেন প্রেসিডেন্টস ভিজিলেন্স ফোর্স (পিএমভিএফ) টিমের প্রধান। তাঁকে আমি টেলিফোন করিনি। কারণ আমার মতো আরো অনেকে অবহিত ছিলেন, রাজাকার বাহিনী গঠনের জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে যেসব অফিসারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় তিনি তাঁদের অন্যতম।

ইতিমধ্যে জাতিদ্রোহী ঘাতকদল রেডিও মারফত অনেক ‘পাকিপন্থী’ ঘোষণা প্রচার শুরু করে দেয়। বাংলাদেশ বেতার হয়ে গেল রেডিও বাংলাদেশ। জয়বাংলা হয়ে গেল বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। তবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ দুই-একবার ঘোষণা দিয়েই স্তব্ধ হয়ে যায় জনরোষের ভয়ে।

কারফিউ জারি করে সব সমাবেশ, মিছিল, সভা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। রাজপথে সাঁজোয়া যান, ট্যাংকও দেখা গেল।

বাস্তব অবস্থাটা কী দেখার জন্য বত্রিশ নম্বরের দিকে যাওয়ার জন্য আমার ছোট ভাই ওবায়দুল কবির খানকে নিয়ে গণভবন-সংলগ্ন বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে মোহাম্মদপুরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রায়ত প্রখ্যাত সাংবাদিক মোদাব্বের সাহেবের বাড়ির সামনে বিহারি একটি ছোট গ্রুপ আমাদের দেখিয়ে বলছিল ‘ভাগরাহা হ্যায়’, অর্থাৎ পালিয়ে যাচ্ছে। রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর সেনা টহল দেখে বাড়িতে ফিরে এলাম।

দুপুরের দিকে ফরাসউদ্দিনের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা যুক্তিযুক্ত মনে হলো। ফরাসউদ্দিনের বাসায় পৌঁছেই তাঁকে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন মনে হলো। তিনি দরজা-জানালা দ্রুত বন্ধ করে দিলেন। উৎকণ্ঠার কারণও ছিল। ফরাসই আমাকে জানিয়েছিলেন বিদ্রোহ দমনের কথা।

এবার মুখোমুখি হতেই ফরাস বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন। বেদনায় তাঁর কণ্ঠস্বর বারবার রুদ্ধ হয়ে আসছিল। ফরাসউদ্দিনের সে দিনের তথ্য মতে, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রান্ত এ খবরে কর্নেল জামিল উদ্দিন, আমাদের সকলের প্রিয় জামিল ভাই নিজেই একটি জিপ নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য। কিন্তু জাতিদ্রোহী ঘাতকরা বত্রিশ নম্বরের মোড়ের আগেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। ফরাস নিজেও রিকশা নিয়ে গিয়েছিলেন। ঘাতকরা তাঁকে মারতে মারতে হটিয়ে দেয়। এরপর সিভিল সার্ভিসের একজন অফিসারের আতঙ্কিত না হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে কি?

কর্নেল জামিল পনেরই আগস্টের কয়েক দিন আগেও ছিলেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে মরণোত্তর পদোন্নতি দেওয়া হয়। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত দুই অফিসারের নাম থাকলেও পরবর্তীকালে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তাঁদের আসামি করা হয়নি। তাঁদের একজন কর্নেল জামিল, অন্যজন ব্রিগেডিয়ার রউফ। কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে কর্নেল জামিলের পদোন্নতিতে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখেছি। ব্রিগেডিয়ার জামিল নিজের জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আনুগত্যের প্রমাণ রেখে গেছেন।

দিনের অধিকাংশ সময় এবং রাতের পুরোটাই রেডিও-টিভিতে জাতিদ্রোহী ঘাতকদের হত্যা-বর্বরতার নানা কেচ্ছা-কাহিনী সবিস্তারে তুলে ধরা হতে থাকে। বাংলার দ্বিতীয় মীরজাফর খন্দকার মোশতাক আহমদের রাষ্ট্রপতি পদে গদিনশিন হওয়া, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান সাহেবের গ্রেপ্তারের খবর, আবদুস সামাদ আজাদ, কোরবান আলী ছাড়া সকল মন্ত্রীর শপথ গ্রহণের এক পুতুল খেলার সচিত্র সংবাদ পরিবেশিত হতে থাকে। ড. কামালকে অবশ্য এ মিছিলে দেখা যায়নি। দেশের বাইরে ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে মীরজাফরদের আনুগত্যের মিছিলেও তাঁকে দেখা যায়নি। সকালেই সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানরা একে একে আনুগত্য জানাতে থাকেন নব্য মীরজাফর মোশতাকের প্রতি। কারো কণ্ঠস্বরে কোনো দ্বিধা, সংকোচ বা জড়তা ছিল না। একমাত্র বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকারকে আনুগত্য শপথ পাঠে একবার হোঁচট খেতে দেখা গেছে।

রাত্রি গভীর হওয়ার সাথে সাথে দুশ্চিন্তার বিস্তৃতিও ঘটতে থাকে। এ কোথায় আমরা এলাম! কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী উচ্ছৃঙ্খল তরুণ সেনা কর্মকর্তা, অপকর্মের দায়ে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কতিপয় কর্মকর্তা নির্দ্বিধায় বিনা বাধায় এমন একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বুক ফুলিয়ে পার পেয়ে যাবে? পিতার এ রক্তস্রোতের ঋণ কি কোনো দিন শোধ হবে না!

অথচ পনেরই আগস্ট কি হওয়ার কথা ছিল! এদিন চ্যান্সেলর/আচার্য্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ সমাবর্তন ও সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্য বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। তারপর থেকে তিনি কোনো দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তীকালে সমাবর্তনের এই আমন্ত্রণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দও একটি পৃথক যৌথ আবেদন জানান বঙ্গবন্ধুর কাছে। এই আবেদনপত্রকারদের উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন ড. আহমদ শরীফ।

পনেরই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হওয়ার কথা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একসময়ে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। বঙ্গবঙ্গু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বানানোর ঘোষণা এ সমাবেশে দিতে চেয়েছিলেন। বক্তৃতার মূল বিষয়গুলো [পয়েন্টগুলো] মোটা মোটা অক্ষরে লিখে দিতে বলেছিলেন। ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু আমাকে টেলিফোন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের দরবারে নতুন আলোয় সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াক অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ হার্ভার্ডের মতো- এটা ছিল একান্ত বাসনা। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা সন্ধ্যায় বসে আলোচনা করে যে সকল পয়েন্ট তৈরি করেছ, তা পৃথকভাবে দেবে বড় হরফে। তবে অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজের লিখবা আলাদা করে। অন্য যা কিছু পয়েন্ট তেরি করো, একটা কথা খুব ভালোভাবে মনে রেখো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য স্কলারশিপ, বৃত্তি, ফেলোশিপ দেওয়া হয় না। সেরা ছাত্রছাত্রীদের কোনো স্বর্ণপদকের ব্যবস্থা নেই। শেরে বাংলা পদক, সোহরাওয়ার্দী মেডেল, মওলানা ভাসানী পদক প্রবর্তন করতে হবে। তোমাদের সন্ধ্যার মিটিংয়ে তো এগুলো আলোচনা হয়েছে। আমি শুনেছি। তবে তোমরা যা লিখে দাও না কেন, আমি এক্সটেম্পোর বলব। তবে সকালে একটু তাড়াতাড়ি এসে তোমার হাতের লেখা অক্ষরগুলো আমাকে একটু ভালো করে বুঝিয়ে দিবা।’ এটাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ টেলিফোন কথা।

রাত ১২টায় বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন শেষ হওয়ার পর ভাবছিলাম সন্ধ্যার ঘটনা ধারা নিয়ে। জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের ৪১ বছর পর আজও চেষ্টা করি পাটিগণিতের কিছু সাধারণ অঙ্কের হিসাব মেলাতে।

গণভবনে আমার অফিস কক্ষে বসে আমরা কজন। পনেরই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন সমাবেশের সম্ভাব্য ভাষণে উল্লেখযোগ্য কী কী বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলতে পারেন, সেটাই ছিল আমাদের আলোচ্য। আমরা কজন, প্রথমেই যাঁর কথা উল্লেখ করতে হয় তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী (ম্যাক স্যার বলেই সমধিক পরিচিত)। সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী। অনেক দিন আগেই ইহজগত ত্যাগ করেছেন। আমাদের সঙ্গে তিনি কিছুক্ষণ ছিলেন। প্রয়োজনীয় কয়েকটি নির্দেশ দিয়ে তিনি চলে যান। তবে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষাসচিব মোকাম্মেল হক ছিলেন সর্বক্ষণ। সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম ও উন্নয়নের কর্মসূচি বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন মোকাম্মেল সাহেব।

আলোচনার মাঝখানে একটি খবর এলো, আগরতলা থেকে কলকাতাগামী একটি ভারতীয় হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়েছে। গুজব রটানো হচ্ছে, বিনা অনুমতিতে যাচ্ছিল বলে সেনাবাহিনী কপ্টারটিকে গুলি করেছে। বিভিন্ন সামরিক সূত্র থেকে আমি খবরটির সত্যাসত্য যাচাইয়ের চেষ্টা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার স্কুলজীবনের বন্ধু বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার প্রয়াত এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাসারের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়া গেল। ভারতীয় হেলিকপ্টারটি বাংলাদেশের অনুমতি নিয়েই আগরতলা থেকে কলকাতা যাচ্ছিল। ফেনীর কাছে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। নিহতদের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। খবরটি তাৎক্ষণিক রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করা আমার একান্ত কর্তব্য বলেই আমি তক্ষুনি সেটা তাঁকে জানাই। তিনি বললেন, তিনিও খবরটি পেয়েছেন। আমি জানতে চাইলাম, খবরটি রেডিও, টিভি ও সংবাদপত্রে যাবে কি না। দেশে জরুরি অবস্থা চলছে, তদুপরি সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী সকল সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, রেডিও-টিভির মালিকানা সরকারের। তাই বিষয়টিতে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু একটু বিস্ময়ের সঙ্গে আমাকে বললেন, একটি সাধারণ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার খবর যদি আমরা প্রকাশ করতে না দিই তাহলে গুজবই তো জমিন পাবে এবং ডালপালা বিস্তার করে অনাসৃষ্টি ঘটাতে চাইবে। বঙ্গবন্ধুর অফিস কক্ষ থেকে আমার রুমে আসার কিছু সময়ের মধ্যেই ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার টেলিফোনে জানতে চাইলেন, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার খবরটি আমরা প্রচার করছি কি না। আমি তাঁকে আমাদের সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করলে তিনি জানতে চান সিদ্ধান্তটি কোন পর্যায়ের। এ সময়ে অস্বস্তি ও বিরক্তি- দুটোই আমি অনুভব করছিলাম। অস্বস্তির কারণ, একটি বন্ধু দেশ থেকে এভাবে জানতে চাওয়ার বিশেষ কোনো কারণ আছে কি না। বিরক্তির হেতু সরকারের সিদ্ধান্ত সরকারের, তা যে পর্যায়ের হোক না কেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের কথা শুনে তিনি জানান, তাহলে ঠিক আছে। ইতিমধ্যে আমরা রেডিও-টিভি-সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্র সকলকেই জানিয়ে দিয়েছি সরকারের সিদ্ধান্ত। বিটিভিতে খবরটি প্রচারিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতার সম্ভাব্য উপাদান ও পয়েন্টগুলো প্রায় শেষ করে এনেছি, এমন সময় টেলিফোন করলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। তিনিও জানতে চাইলেন ভারতীয় হেলিকপ্টরের খবরটি যাচ্ছে কি না। যার মন্ত্রণালয়কে সবার আগে জানানো হয়েছে, যার মন্ত্রণালয়ের অধীন বিটিভি-রেডিও-বিএসএস (সংবাদ সংস্থা) তাদের জানানো হয়েছে সেই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবার জানতে চাইলেন সিদ্ধান্তের কথা।

ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বোধগম্য। কারণ ভারতে জরুরি অবস্থা চলছিল। সংবাদপত্র, রেডিওর ওপর আরোপিত কঠোরতম সেন্সর ব্যবস্থা। তাই বাংলাদেশের রেডিও-টিভির খবরে উদ্বেগ তথা দুর্ভাবনা স্বাভাবিক। কিন্তু তথ্য প্রতিমন্ত্রী না জানার বিষয়টি আমার কাছে পাটিগণিতের সেই সাধারণ অঙ্কের মতোই মনে হয়, যার হিসাব আজও মেলাতে পারিনি।

পাটিগণিতের আরেকটি অংক একটি নৈশভোজ। যার হিসাব মিলে যায় ঠিকই, কিন্তু কোনো পরীক্ষায় ও অংকের সঠিক উত্তরের জন্য নম্বর মেলে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতার পয়েন্টগুলোর খসড়া তৈরি শেষ। এরপর বাড়িতে বসে কার্ডে সেটা বড় হরফে হাতে লিখতে হবে, যাতে বঙ্গবন্ধুর দেখতে অসুবিধা না হয়। এই সময়ে গণভবনের কম্পট্রোলার সুবেদার মেজর আবুল খায়ের খবর দিলেন, বঙ্গবন্ধু বত্রিশ নম্বরে চলে গেছেন। আপনাদের ডিনার রেডি। ডিনারটি গণভবনের নয়, আমরা দশ টাকা করে চাঁদা দিয়ে ওই ডিনারের আয়োজন করি। গণভবনের তিন উজ্জ্বল নক্ষত্র যুগ্ম সচিব মরোয়ারুল ইসলাম, একান্ত সচিব মসিউর রহমান এবং একান্ত সচিব ফরাসউদ্দিন আহমদ, তিনজনই স্কলারশিপ নিয়ে এমআইটি ও হার্ভার্ডে ডক্টরেট করতে যাচ্ছেন। তাঁদের বিদায় উপলক্ষে এই ‘পেড ডিনার’। ডিনারে সচিব আবদুর রহিম, সচিব ড. সাত্তার সবারই থাকার কথা ছিল। কিন্তু গিয়ে দেখলাম, সচিব রহিম সাহেব ও ড. সাত্তার দুজনেই মাফ চাইছেন ডিনারে থাকতে পারবেন না বলে। গুলশানে তাঁদের একটি ডিনার আছে, আগে থেকেই নির্ধারিত।

পাটিগণিতের তিন অঙ্কের জটিলতম উপাদানটি হচ্ছে এই গুলশান ডিনার। ডিনারটি ছিল মাহবুব আলম চাষীর বাড়িতে। আমন্ত্রিতদের সকলেই কুমিল্লার অধিবাসী। পনেরই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা প্রত্যেকেই উল্লেখযোগ্য পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে উজ্জ্বল শুভ্র একটি দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার আশা ছিল। উজ্জ্বল শুভ্র দিনের পরিবর্তে জাতিদ্রোহী ঘাতকদের বর্বর হত্যাকাণ্ডে নেমে এলো অমাবস্যার কালরাত্রি। ১৪ আগস্টের সন্ধ্যাতেই শুরু অমাবস্যার সন্ধ্যা।

লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক জনকণ্ঠ
১৫ আগস্ট পর্যন্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেসসচিব