শুদ্ধতম জাতীয়তাবাদী শ্রেষ্ঠতম বাঙালি

 

হারুন হাবীব

কিছু নাম থাকে, যা অবিনশ্বর। সে নামকে উপেক্ষা করার শক্তি কারো হয় না, যদিও কেউ কেউ সে মূর্খতা দেখায়। এ নাম কবরের, কালের সীমা ছাড়িয়ে সোচ্চার ও শক্তিধর হয়ে মহাকালের আঙিনায় টিকে থাকে। এ নাম মহাপুরুষের। এঁদের যা কীর্তি- তা অস্বীকার করার জো নেই; যদিও কেউ কেউ আত্মপ্রবঞ্চক বা আত্মঘাতী হয়ে শাশ্বত সত্যকে অস্বীকার করতে উদ্যোগী হয়!

শেখ মুজিবুর রহমান, ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে উচ্চারিত না হলে যে নাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তেমনি এক নাম। এ নামকে জোর করে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, জোর করে মুছে দেওয়াও সম্ভব হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, চীনের মাও সেতুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, ইন্দোনেশিয়ার সোয়েকর্ন, আফ্রিকার প্রথম মুক্ত উপনিবেশ ঘানার পেট্রিস লুমাম্বা, কওমি নক্রুমা, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন এবং যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো যেমন, তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নামে এঁরা এক না হলেও কীর্তিতে প্রায় অভিন্ন; আপন গৌরবে ভাস্বর।

যে নাম শেখ মুজিবুর রহমানের- তাঁর সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশ; সব ধর্ম, সব বর্ণের মানুষের কল্যাণে বাঙালির জন্য আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ফসলবাহী প্রথম রাষ্ট্র পত্তনের ইতিহাস। হাজার বছরের যে বাঙালি, কখনো বিচ্ছিন্ন, কখনো পরাজিত, নিরবচ্ছিন্ন লড়াকু ও জাতিসত্তা অন্বেষণে বিভ্রান্ত কিংবা বিপর্যস্ত- সেই বাঙালির জন্য প্রথম আধুনিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতির নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কাজেই এ নাম স্বমহিমায় দীপ্যমান; না হয় কারো কারো মূর্খতায় তাঁকে অশ্রদ্ধা দেখানোর কদর্যতাও চলে কখনো কখনো!

অনেক সংকট, সীমাবদ্ধতা এবং আকাশচুম্বী সাফল্য নিয়ে শেখ মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, যিনি তাঁর দেশপ্রেম, মেধা ও ত্যাগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক স্বৈরাচার, ধর্মীয় মিথ্যাচার, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার মানুষকে অধিকার সচেতন করে তুলেছিলেন। সেদিনকার পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রায় একচ্ছত্রভাবে বেগবান ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিলেন এবং মুসলমানপ্রধান একটি জনপদে জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলাদেশ বিশ্বের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সে কারণেই ব্যতিক্রম এবং সে ব্যতিক্রমের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এক অসামান্য রাজনীতিবিদ তিনি। রাজনীতির কীর্তিমান এই কবি একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি মানস ও বঙ্গের মাটির সঙ্গে, তাদের দীর্ঘ লালিত আশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে। আমাদের দুর্ভাগ্য, সে ইতিহাস কেউ জানতে চাই, কেউ চাই ঢাকতে। অথচ বাংলাদেশ যত দিন থাকবে তত দিনই প্রাসঙ্গিক থাকবেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি জেগে উঠলেই উগ্র-ধর্মবাদী, উগ্র তত্ত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে; হত্যাকাণ্ডের কয়েক যুগ পরও সে কারণে শেখ মুজিব সেক্যুলার সমাজশক্তির মুখ্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন।

শুদ্ধতম জাতীয়তাবাদী শ্রেষ্ঠতম বাঙালি

সাহিত্য, শিল্প আর দর্শনে বাঙালিকে প্রথম বিশ্বনন্দিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নেতাজি সুভাষ ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদবিরোধী সর্বভারতীয় গণমানুষের মহানায়ক। এরপর আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির ইতিহাসে যিনি স্বাধীন-সার্বভৌম এক আধুনিক রাষ্ট্রের রূপকার, স্থপতি। বিস্ময়কর যে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সেদিনকার পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁরই নেতৃত্বে, তাঁরই নাম ও অনুপ্রেরণায় পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সফল মুক্তিযুদ্ধ।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক জাতি হয়েও বাঙালি কখনো একাত্ম হতে পারেনি। স্বশাসিত হওয়ার বড় বেশি সুযোগ ঘটেনি বাঙালির। ধর্মীয় কুসংস্কার, সংকট, ষড়যন্ত্র, লোভ-দাসত্ব ইত্যাদি বারবার আঘাত করেছে বাঙালিকে। এক হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাভাষী মানুষ, স্বশাসিত হওয়ার স্বপ্ন তাই ম্লান হয়েছে বারংবারের দুর্ভাগ্যে। শেখ মুজিবই প্রথম সবল-সফল মহান রাজনীতি-পুরুষ, যিনি তাঁর অনন্য সাধারণ নেতৃত্বের গুণে জাতির অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন চেতনাকে বিকশিত করেছিলেন। গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে ওঠে, জাতিকে এক দেহ, এক আত্মায় সমর্পিত করেছিলেন, জাতীয় স্বাধীনতার জনযুদ্ধে নামিয়েছিলেন।

শেখ মুজিব ছিলেন এমনই মহানায়ক, যাঁর রাজনীতি কখনোই গোপন পথে বিচরণ করেনি। সশস্ত্র যুদ্ধে জাতিকে এগিয়ে নিতেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক পথ। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করতে পারেনি কেউ। রাজনীতির সন্ত্রাসবাসী পথকে তিনি সযতেœ পরিহার করেছেন। বুলন্দ কণ্ঠের মতোই তাঁর আদর্শ ছিল মুক্ত, সুস্পষ্ট ও আপসহীন। প্রায় সারাটি জীবন পাকিস্তানিদের হাতে কারা-নির্যাতন ভোগ করেছেন; অসংখ্যবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, অসংখ্য মামলায় জড়ানো হয়েছে তাঁকে। কিন্তু চরম নির্যাতনেও শেখ মুজিব ভাঙেননি, মোচড়াননি, পরাজিত হননি। নেতাজি সুভাষের পর তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অবিভাজিত নিষ্কলুষ যৌবনশক্তির প্রতীক; নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সাহসের প্রতীক। বাংলাদেশ নামের যে প্রিয় কবিতা, তারই অমর কবি হতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী শক্তি, ত্যাগ ও আদর্শনিষ্ঠা তাঁকে পরিণত করেছিল ইতিহাসের গণদেবতায়। এমন অসাধারণ জনপ্রিয়তা আর কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাগ্যে জোটেনি। বিদেশিরা তাঁকে বলত ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’। কিন্তু শেখ মুজিব একই সঙ্গে ছিলেন ‘পোয়েট অব হিউমিনিটি অ্যান্ড জাস্টিস’। তিনি জাতিকে আত্মসচেতন করে তুলেছিলেন, জাতীয়তাকে ভাষা দিয়েছিলেন, নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গ্রামগঞ্জ থেকে শহর-নগর-বন্দরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কোনো রাজনৈতিক নেতার জীবনে বিস্ময়কর অর্জন বটে!

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। রক্তাক্ত শেষ নিঃশ্বাসে প্লাবিত করা হয় তাঁর পরিবারের প্রায় সবাইকে; শিশু, বয়োবৃদ্ধ, নববধূকে পর্যন্ত! এ হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের বর্বরতম সন্দেহ নেই।

কিন্তু আমার বলার বিষয় ভিন্ন। মানুষ জন্মায়। মৃত্যু তাই অবধারিত। বাঙালির দুর্বার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন যখন, তখনো পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের হাতে প্রাণ দিতে পারতেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালে যখন তাঁকে বন্দি রাখা হয় পাকিস্তানের মাটিতে, তখনো তাঁর প্রাণসংহার অসম্ভব কিছু ছিল না। এমনকি ১৫ আগস্ট ঘাতকরা যখন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, এর আগেও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারতেন শেখ মুজিব, যেকোনো উপলক্ষে।

অতএব মৃত্যু বড় নয়, বড় শেখ মুজিবের হত্যার পেছনের কারণ, তার ফলাফল এবং পরবর্তী সময়ে বেরিয়ে আসা থলের বিড়াল। এই হত্যাকাণ্ডের কুশীলব ও তাদের সঙ্গোপন সমর্থকরা আজও, এত বছর পরও প্রতিটি পদক্ষেপে বুঝিয়ে দিচ্ছে, কেন তারা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল, কেন তারা ভয় পায় এ নামটিকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে, এযাবৎকালের শ্রেষ্ঠতম পুরুষ, সন্দেহ নেই এ উচ্চারণে। সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে তাঁর প্রশাসনকে চরম সংকটময় সময় পার করতে হয়েছে। একদিকে নতুন রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী বিদেশি শক্তিধররা, অন্যদিকে পরাজিত পাকিস্তানের দেশীয় অনুচররা, যারা প্রতি পদে প্রতিবন্ধক তৈরি করেছে। সর্বশক্তি দিতে হয়েছে তাঁকে যুদ্ধে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো পুনরুদ্ধারে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার কারণ, যেকোনো ইতিহাস সচেতন মানুষই স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সংকট বা অসম্পূর্ণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই হত্যাকাণ্ড ছিল জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ ও প্রত্যক্ষ প্রতিশোধ। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁকে হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারীরা সদ্য-স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাই কেবল বিনষ্ট করতে চায়নি, সেই সঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসের অমর গৌরবগাথা; পাল্টে দিতে চেয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ও অর্জন। ষড়যন্ত্রকারীরা যথেষ্ট সফলও হয়েছিল, আমার ধারণা, যতটা তারা চেয়েছিল, তার চেয়েও বেশি! নিঃসন্দেহে সে ছিল এক জাতীয় ট্র্যাজেডি।

আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার যে পাপ জাতিকে গ্রাস করেছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে অনেককাল। ওই হত্যা বাঙালিকে ঘাতক জাতিতে পরিণত করেছে, অগণিত মৃত্যু দিয়ে কেনা স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে; ওই হত্যা স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে পরিত্যক্ত সেই পাকিস্তানি রাজনীতি, সেই সংস্কৃতি, ধর্মের চাতুরী দিয়ে, অসাংবিধানিক শাসন দিয়ে মুক্তচিন্তার সমাজ-প্রগতিকে বিনাশ করার সর্বনাশা সেই ধারা- যাকে পরাজিত করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

আজকের এই জাতীয় শোকের মাসে, অনেক কাল পরও সবাইকে প্রশ্ন করতে হবে, কেন হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনককে? যাঁরা ওই হত্যায় নীরব ছিলেন, যাঁরা সাময়িক স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রতিবাদ করেননি, আমার বিশ্বাস, তাঁরাও আজ বুঝতে সক্ষম যে ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁদের প্রিয় জন্মভূমিকে, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে, অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাকে, লাখো শহীদের রক্তকে, সর্বোপরি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও তার সংস্কৃতিকে কতটা বিপন্ন করেছে!

আমার বিশ্বাস, শেখ মুজিবের হত্যা পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে সহনশীল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রত্যক্ষ প্রতিশোধ। এই হত্যা রাজনৈতিক ইসলামবাদী ও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের পাল্টা আঘাত। ওরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল, নিয়েছিলও। ফলে একাত্তরের ঘাতক-দালাল, উগ্র ইসলামবাদী সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসেছে, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের অশ্রদ্ধা হয়েছে; শহীদের আত্মা বিক্ষত হয়েছে।

ইত্যাকার ব্যর্থতার পরও আমার বিশ্বাস, শেখ মুজিব কিংবা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মৃত্যু হয়নি। এ নাম দুটিকে হত্যা করা যায়নি; যাবেও না কখনো। আত্মসম্মান ও আত্মরক্ষার তাগিদেই মুক্তিযুদ্ধকে যেমন আঁকড়ে ধরতে হবে, জঙ্গিদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে এবং আজ হোক, কাল হোক, সসম্মানে সেই আসনেই বসাবেন শেখ মুজিবকে, যে আসন তাঁরই একমাত্র প্রাপ্য।

বাংলাদেশের মাটিতে মৌলবাদী বা পাকিস্তানপন্থীদের তৎপরতা যত বাড়বে, যত ওরা শক্তি সঞ্চয় করবে, যত আধুনিক বাংলাদেশকে ওরা গ্রাস করতে চাইবে, তত দ্রুত আশ্রয় খুঁজতে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাছে, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে। কারণ তিনি জাতীয় অস্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, বাঙালির জাতীয় অহংকারের প্রতীক।

আমি এটিও বিশ্বাসে দৃঢ় যে বিভিন্ন দলমতে বিশ্বাসী হয়েও, নানামুখী ধারা বহন করেও জাতীয় আত্মরক্ষার তাগিদেই বাঙালিকে বারবার ফিরে যেতে হবে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনায় এবং আবারও হয়তো একাত্তরের মতো নতুন রণাঙ্গনে। তার নাম যদি হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ, হোক; যদি হয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, হোক।

কাজেই আজ ও অনাগতকালে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই শেখ মুজিবুর রহমানকে বুকে টানতে হবে। কারণ তিনি জাগ্রত মহানায়ক। টুঙ্গিপাড়ায় শুয়ে থেকেও তিনি আজ ও আগামীকালের যুদ্ধের অমোঘ সেনাপতি; বেঁচে থাকার, সামনে এগিয়ে যাওয়ার মূল অনুপ্রেরণা। তিনি নিশ্চয়ই আসবেন, কারণ তিনি নেতা এবং সেই সঙ্গে আসবে ‘জয় বাংলা’, যে উচ্চারণ গণমানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে। মনে রাখা উচিত, যে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বাংলাদেশকে আজ ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে শত্রুরা আজ সংঘবদ্ধ, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে কেবলই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনা, যার বিকাশ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আজ কোনো দলের নন। তিনি জাতির এবং এ কথাও বিশ্বাস করতে রাজি নই যে ওই মহাপ্রাণকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ দলভুক্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ নামে যার আস্থা, বাংলাদেশের হৃদয়ে যার বিশ্বাস, তার কাছেই শেখ মুজিব শ্রদ্ধার, ভালোবাসার ও অহংকারের। যে বাঙালির হৃদয়ে দাসত্ব নেই, পরাধীনতা ও উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা নেই, সে বাঙালিকেই গ্রহণ করতে হবে শেখ মুজিবকে। এ নামের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও কলামিস্ট