ডেঙ্গু আঘাত হানছে বিনা লক্ষণে, ব্লাড প্রেসার কমলেই সাবধান হোন: ডা. আসিফ সৈকত

দেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এরইমধ্যে চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ অনেক রোগী মারা গেছেন। ঢাকায় হাসপাতালগুলো আর নিতে পারছে না নতুন রোগী। অবস্থাটা এমন, অনেক চিকিৎসকও বুঝে উঠতে পারছেন যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি।

এ পরিস্থিতিতে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের  ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. আসিফ সৈকত বিশেষ করে চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পরামর্শে ডা. আসিফ লিখেছেন, ‘এবার ডেঙ্গু এসেছে অনেকটা প্রতীকী রূপ ধারণ করে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে এমনটিই মনে হচ্ছে। এ‌ই ডেঙ্গুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্লাজমা লিকেজ। শরীরে রক্ত সঞ্চালনের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে অঙ্গে। প্লাজমা লিকেজ আর চরম সেলুলার ডিহাইড্রেশনের কারণে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিস।’

তিনি লিখেছেন, ‘অনেকের ধারণা, ডেঙ্গু হলে ভীষণ জ্বর হয়, শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে, প্লাটিলেট কমে। কিন্তু এবার ডেঙ্গু রোগিদের ক্ষেত্রে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, শরীরে ফুসকুড়ি কম উঠছে, ব্যথা কম; কমছে না প্লাটিলেটও। সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, সেলুলার ডিহাইড্রেশন এবং প্লাজমা লিকেজ। শরীরে মাইক্রো ভ্যাসকুলেচার লিকেজ হচ্ছে কিন্তু টের পাচ্ছেন না রোগী।’

ব্লাড প্রেসারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. আসিফ লিখেছেন, ‘চিকিৎসক সহকর্মীদের বলব, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ব্লাড প্রেসারে (বিপি)। মনে রাখতে হবে ৩০-৪০% ফ্লুইড না হারালে হাইপোভলিউমিক শক-এর  ক্লিনিক্যাল ফিচার পাওয়া যাবে না। কাজেই বিপি কমে যাওয়া মানে হচ্ছে এরইমধ্যে পিটি ৩০-৪০% ফ্লুইড ভলিউম হারিয়ে ফেলেছে। সুতরাং, বিপি খেয়াল রাখতে হবে। যদি ডায়াস্টোলিক বিপি বাড়তি পাওয়া যায়, ধরে নিতে হবে রোগীর পালস প্রেসার কমছে। প্রতিটি অর্গান পারফিউশনের জন্য ন্যূনতম ৬০ -৭০ মিমি এমএপি (আর্টারিয়াল) প্রেসার প্রয়োজন। আর পালস প্রেসার কমে যাওয়া মানেই তা শক-এর প্রাথমিক লক্ষণ। এটি খেয়াল রাখতে হবে।’

জ্বর চলে গেলেও এলএফটি, সিআরপি করাতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘জ্বর চলে গেলেও এলএফটি, সিআরপি করাতে হবে। এতে শক লিভার  সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। সিরাম ক্রিয়েটিনাইনও করিয়ে রাখতে হবে। যদি ডায়াসটলিক বিপি বেশি পাওয়া যায় ২-৩ এমএল/কেজি/বিডাব্লিউ /ঘণ্টা হিসেবে সাপ্লিমেন্টারি ক্রিস্টালিড দেওয়া যেতে পারে (তবে প্রগ্রেসিভ শক বা স্টাবলিশড শকে কোলয়েড + ক্রিস্টালয়েড)। রোগী মুখে খাবার খাবে। ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। রোগিকে  ভিটামিন ‘সি’ দিতে হবে। এটি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে মারাত্মক কার্যকর। স্যালাইনেও ইনজেকশন অ্যাসকাসন ১ এএমপি করে দিয়ে রাখতে হবে।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘রোগীর প্রস্রাব খেয়াল রাখতে হবে। বোতলে দাগ কেটে রোগীকে বলতে হবে সেখানে প্রস্রাব করতে। প্রস্রাবের ন্যূনতম আউটপুট ১এম১ /কেজি/ঘণ্টা হতে হবে। কোনো কোনো রোগীর গ্যাস্ট্রোয়েনটারিটিস পাতলা পায়খানা হচ্ছে। তলপেটে ব্যথা হলে অবশ্যই ইউএসজি করিয়ে নিতে হবে। ফুসফুসের অসকালটেশন করাতে হবে। রোগীর শ্বাসকষ্ট বা অক্সিজেন চাহিদা বাড়ছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। ইসিজি, ট্রপ ১ করিয়ে রাখতে হবে। ভাইরাল মায়োকার্ডিটিস/পেরিকার্ডিটিস নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো এনএসএইডস দেওয়া যাবে না, কেবল প্যারাসিটামল দিতে হবে। ডেঙ্গু যথাযথভাবে অপসারণ না করে কোনো অ্যান্টিপ্লাটিলেট দেওয়া যাবে না।’

পরামর্শের শেষাংশে ডা. আসিফ লিখেছেন, ‘যদি ডেঙ্গু এনএস ১ এবং এলজিজি, এলজিএম -ভিই পান এবং  চিকুনগুনিয়া আরটি পিসিআর করে রাখতে হবে। দুটোই এডিস থেকে  ছড়ায়। আমরা কিন্তু এখনও নিশ্চিত নই- ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া নিজেদের মধ্যে জেনেটিক কোড, জিনোম আদান প্রদান করে শক্তিশালী কোনো প্রজাতি জন্ম দিয়েছে কি-না!’