ডেঙ্গুতে আক্রান্তের লক্ষণ ও করণীয়

রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। গত দুই সপ্তাহে ডেঙ্গুতে চিকিৎসকসহ অন্তত আটজন মারা গেছে। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেনে নিন ডেঙ্গুতে আক্রান্তের লক্ষণ ও করণীয় :

ডেঙ্গুর লক্ষণ

সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর আবারও জ্বর আসতে পারে। এর সঙ্গে শরীরে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা ও চামড়ায় লালচে দাগ (র?্যাশ) হতে পারে। তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে।

জ্বর হলেই অবহেলা নয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুর সময়, সে জন্য জ্বর হলে অবহেলা করা উচিত নয়। জ্বরে আক্রান্ত হওয়া মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছে, তারা জ্বরকে অবহেলা করেছে। জ্বরের সঙ্গে যদি সর্দি-কাশি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা অন্য কোনো বিষয় জড়িত থাকে তাহলে সেটি ডেঙ্গু না হয়ে অন্য কিছু হতে পারে।

থাকতে হবে বিশ্রামে

সরকারের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল বা সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ বিভাগের অন্যতম পরিচালক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, জ্বর হলে বিশ্রামে থাকতে হবে। জ্বর নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করা ঠিক নয়। একজন ব্যক্তি সাধারণত প্রতিদিন যেসব পরিশ্রমের কাজ করে, সেগুলো না করাই ভালো। পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন।

যা খাবেন

প্রচুর পরিমাণ তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস ও খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। এমন নয় যে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে, পানিজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

ওষুধ নিয়ে সচেতন হোন

অধ্যাপক তাহমিনা বলেন, ডেঙ্গু হলে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। স্বাভাবিক ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ চারটি প্যারাসিটামল খেতে পারবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, প্যারাসিটামলের সর্বোচ্চ ডোজ হচ্ছে প্রতিদিন চার গ্রাম। কিন্তু কোনো ব্যক্তির যদি লিভার, হার্ট ও কিডনিসংক্রান্ত জটিলতা থাকে; তাহলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শরীরের ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ সেবন করা যাবে না। ডেঙ্গুর সময় অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

প্লেটিলেট বা রক্তকণিকা

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্লেটিলেট বা রক্তকণিকা এখন আর মূল ফ্যাক্টর নয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক তাহমিনা। তিনি বলেন, প্লেটিলেট কাউন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বিষয়টি চিকিৎসকের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। সাধারণত একজন মানুষের রক্তে প্লেটিলেট কাউন্ট থাকে দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ পর্যন্ত।

কখন হাসপাতালে ভর্তি

ডেঙ্গুর তিনটি ভাগ আছে। এ ভাগগুলো হচ্ছে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’। প্রথম ক্যাটাগরির রোগীরা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে। তাদের শুধু জ্বর থাকে। বেশির ভাগ ডেঙ্গু রোগী ‘এ’ ক্যাটাগরির। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা নেই। ‘বি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু রোগীর সবই স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন তার পেটে ব্যথা হতে পারে, বমি হতে পারে প্রচুর কিংবা সে কিছুই খেতে পারছে না।

অনেক সময় দেখা যায়, দুই দিন জ্বরের পরে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই ভালো। ‘সি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু সবচেয়ে খারাপ। ক্ষেত্রবিশেষে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন হতে পারে।

ডেঙ্গুর সময়কাল

সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। এ সময়ে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গুর সময়কাল আরো এগিয়ে আসছে। এখন জুন মাস থেকেই ডেঙ্গুর সময় শুরু হয়ে যাচ্ছে।

যখন এডিস মশা কামড়ায়

ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। সাধারণত সকালের দিকে ও সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা তৎপর হয়ে ওঠে। তবে অন্ধকারে কখনো কামড়ায় না।

পানি জমিয়ে না রাখা

অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলছেন, এডিস মশা ‘ভদ্র মশা’ হিসেবে পরিচিত। এসব মশা সুন্দর সুন্দর ঘরবাড়িতে বাস করে। এডিস মশা সাধারণত স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। কোথাও যাতে পানি তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি জমা না থাকে।

এ পানি যেকোনো জায়গায় জমতে পারে। বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন পয়েন্টে, সড়কের পাশে পড়ে থাকা টায়ার কিংবা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। সূত্র : বিবিসি।