নিরাপদ খাদ্য ও আগামী প্রজন্ম

বেঁচে থাকার জন্য চাই নিরাপদ ও সুষম খাবার। আর এ খাবারের জন্য মানুষের লড়াই যুগ যুগ ধরে। আগে ছিল দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে আর এখন নিরাপদ খাবারের জন্য। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত সুবিধা আবিস্কার হওয়ার পরও খাদ্য নিরাপদ করার ক্ষেত্রে আমরা সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। অর্থনীতিতে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এ দেশের ৮৩ শতাংশ মানুষ এক দিনের রোজগার দিয়ে এক দিনের খাওয়া হতো না। সে সময় মানুষের মুখে এক মুঠো ডাল-ভাত দেওয়াই ছিল রাষ্ট্রের অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নিরাপদ-অনিরাপদ নিয়ে আমরা কেউ তখন বেশি মাথা ঘামাইনি। এখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। তাই খাদ্য উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহারও আধুনিক কৃষি পরিচর্যা হয়েছে অত্যাবশ্যকীয়। ফলে চাহিদা পূরণে উন্নত জাতের ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, প্রক্রিয়াজাতকৃত পশুখাদ্য, ভেটেরিনারি ড্রাগ ইত্যাদি আমাদের খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। আমদানিনির্ভর কৃষি উপকরণের কোম্পানি হয়েছে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহদাকার শিল্প কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বাজারে খাবার সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি হওয়ার কারণে খাদ্য উৎপাদন ও জোগান উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। হরেক রকমের খাবারের দোকান হয়েছে। দেশি-বিদেশি রেস্টুরেন্ট হয়েছে। কিন্তু এত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি যে ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা দরকার ছিল, তা হয়নি। মান নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া, ল্যাব ও জনবল না রেখেই যেনতেনভাবে বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো নিরূপণ না করেই কৃষি উৎপাদন হচ্ছে। শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না রেখেই হচ্ছে পণ্য উৎপাদন। পৃথিবীর মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ বাংলাদেশ। দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের একটি নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। ফলে ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির কারণে সীমিত মানুষ রাষ্ট্রীয় সুযোগ ভোগ করে। প্রতিটি সমস্যার মূল কারণ উদ্ঘাটন না করে স্বল্পমেয়াদি আইনি সমাধানে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সমতাভিত্তিক অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হয় না। তাই অগ্রাধিকার মৌলিক বিষয়গুলো চিহ্নিত করে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের তাই সবার আগে খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ-পুষ্টিকর খাবার ও পরিবেশ সংরক্ষণ জাতীয় সামাজিক আন্দোলন হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চয়তার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে সাধারণ আলোচনা করলে দেখা যায়, তিনটি প্রধান বিষয় নজর দেওয়া জরুরি-১. উৎপাদনের প্রাথমিক স্তরের ত্রুটি চিহ্নিতকরণ :কৃষি ফসল, মৎস্য ও পশুপাখির খামারে খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। ফসলি জমিতে চাষ শুরু করার পূর্ব থেকে শস্য মাড়াইকরণ পর্যন্ত যেসব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহূত হয়, তা সঠিক আছে কি-না তা যাচাই করতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ফসলে-খামারে ব্যবহূত বালাইনাশক-রাসায়নিককে প্রধান চারভাগে শ্রেণিবিন্যাস করেছে। রাসায়নিক সার ও প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটের (পিজিআর) টক্সিসিটি-বিষক্রিয়া চারটি গ্রুপের চেয়ে অনেক গুণ কম ও নিরাপদ। এ দেশে উল্লিখিত চারটি গ্রুপের কীটনাশক আমদানির সরকারি অনুমোদন থাকার কারণে আমাদের খাদ্যে বিষক্রিয়ায় রেসিভিউ থাকার সুযোগ আছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে সব ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক মাটিতে, পানিতে, বাতাসে, ফসলে, গুদামে শিল্পের কাঁচামালের নিমিত্তে নেওয়ার সময়, পূর্ব ও পরে ব্যবহূত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী কৃষককে দায়ী করা যায় না। বাজারে যা সরবরাহ করা আছে তা বৈধ বলেই কৃষক তার ফসল সবসময় ব্যবহার করছে।

এখনও আমাদের দেশের দরিদ্র কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। ফলন বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদিত ফসলের যথাযথ মূল্য পায় না। কারণ তার ফসলের মূল্য সংযোজন করার ক্ষমতা নেই। যদি ব্যাপক কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং খাদ্য বহির্বিশ্বে নিরাপদ-বিষমুক্ত খাবার হিসেবে স্বীকৃতি থাকত, তাহলে চাহিদা বেশি থাকার কারণে স্থানীয় বাজারে উচ্চমূল্যে কৃষক ফসল বিক্রি করতে পারত। এখন একদিকে যেমন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে স্থানীয় বাজারে ব্যাপক চাহিদা নেই; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বৃহত্তর বাজারে আমাদের কৃষিপণ্য নিরাপদ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত নয়। ফলে কৃষকের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে জীবন দুর্বিষহ। তাই খাদ্যকে নিরাপদ ও বিষমুক্ত করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দেশের কৃষকের বৃহত্তর স্বার্থে খাদ্য নিরাপদ করতে হবে। অন্যদিকে পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে কৃষি চাষ হয় অথচ বালাইনাশক ব্যবহূত হয় না। উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো, আমরা অতি উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত শ্রেণির বালাইনাশক আমদানি অনুমোদন বহাল রেখেছি। তাই খাদ্য নিরাপদ করতে হলে সবার আগে এটা ঠিক করতে হবে।

২. শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মজুদকালের ত্রুটি চিহ্নিতকরণ :খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাত করার আগেই এগুলো সংরক্ষণের জন্য উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়া বালাইনাশক-প্রিজারভেটিভ দেওয়া থাকে। তাই আমদানি অনুমোদনের সময় মজুদকালে ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিকগুলো নির্দিষ্টকরণ করতে হবে। সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করে তা কার্যকর করতে হবে।

৩. শিল্পে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে, হোটেল-রেস্টুরেন্টের ত্রুটিগুলো শনাক্তকরণ :খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সর্বশেষ ধাপ এটি। শিল্প কলকারখানায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি ও ল্যাব সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ থেকে পানিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসা পানিতে এবং বাতাসে ছড়াচ্ছে। সেটা আমাদের ফুড চেইনে ঢুকে যাচ্ছে। এমনকি ওইসব বিষাক্ত উপাদান আবার কৃষি ফসলে ও গবাদিপশু হয়ে মানবদেহে প্রবেশ করার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন এজেন্ডা হবে নিরাপদ-পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। সে জন্য অতিমাত্রায় বিষাক্ত বালাইনাশক আমদানি অনুমোদন অনতিবিলম্বে স্থগিত করে নিরাপদ বালাইনাশক স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে সরকারকে বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। আমরা যদি স্থানীয়ভাবে বালাইনাশক উৎপাদনে সামর্থ্য হই, তাহলে এর মান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। শতভাগ আমদানিনির্ভর বালাইনাশক ব্যবসার পরিবর্তে অতি সামান্য মাত্রার বিষক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে উৎসাহিত করতে হবে এবং বালাইনাশক আমদানি-উৎপাদনে নীতিমালা সংশোধন করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিশ্নেষক