চার বছরের মধ্যেই নিরাপদ সবজি

শীতকালীন বাহারি সবজি এখন আর কেবল শীতকালেই নয়, পাওয়া যাচ্ছে বছরজুড়ে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সারা বছরই যশোরের মাঠে চাষ হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ রকমের সবজি। সদর উপজেলার সাতমাইল, বারিনগর, মানিকদিহি, হৈবতপুর, তীরেরহাট, চূড়ামনকাটি, আমবটতলাসহ কয়েকশ গ্রামে মাঠের পর মাঠ সবজির ঢেউ থাকে সব সময়। সদর ছাড়াও সবজি চাষ হয় বাঘারপাড়া, মণিরামপুর, ঝিকরগাছা উপজেলায়। এসব উপজেলার হাজারো কৃষক বছরজুড়ে উৎপাদন করছেন ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন সবজি, যা যশোরসহ আশপাশের অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। উৎপাদিত এসব সবজিই কি নিরাপদ? এ নিয়ে আছে নানা বিতর্ক।

চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে যশোর জেলায় ১৪ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। গত শীত মৌসুমে ১৫ হাজার ৭৮৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছিল। পোকা লাগা সবজি বাজারে নিলে বিক্রি হবে না। বিক্রি হলেও ভালো দাম পাওয়া যাবে না। তাই একসময় যশোর অঞ্চলে উৎপাদিত প্রায় শতভাগ সবজিতেই প্রয়োগ করা হতো বৈধ-অবৈধ নানা ধরনের কীটনাশক। কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানা হতো না কোনো নিয়মকানুন। সাধারণত দেখা যায়, কীটনাশক প্রয়োগের ৭ থেকে ১০ দিন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৪ দিন পর সবজি তুলে বাজারে নেওয়ার নিয়ম। যেখানে ৮ থেকে ১০ দিন পর পর কীটনাশক ¯ন্ডেপ্র করলেই চলে, সেখানে বেশির ভাগ কৃষক সপ্তাহে দুই-তিনবারও কীটনাশক ¯ন্ডেপ্র করতেন। অনেক ক্ষেত্রে সবজিতে কীটনাশক ¯ন্ডেপ্র করার পরদিনই তা তুলে বাজারে বিক্রি করা হতো। কীটনাশক ¯ন্ডেপ্র করার সময় মাথায় হেলমেট অথবা মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাবস, পায়ে জুতা পরার কথা থাকলেও কোনো চাষি তা করতেন না।

এসব নিয়মকানুনের কথা কীটনাশকের প্যাকেটে দেওয়া থাকলেও কেউ তা পড়ে দেখতেন না, যে কারণে এসব কীটনাশক চাষিদের স্বাস্থ্যের যেমন মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছিল, সবজির ভোক্তারাও পড়ছিলেন নানা শারীরিক জটিলতায়। কিন্তু কয়েক বছর আগে ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমনে ফেরোমেন হরমন ট্রাপ পদ্ধতি আসার পর থেকে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, যশোর সদর উপজেলায় প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজিতে এখন ফেরোমেন ট্রাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। আর পুরো জেলায় এ পদ্ধতিতে কীটনাশক দমন করা হচ্ছে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে। খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, পটোল, করলা, লাউ, কুমড়া, গ্রীষ্মকালীন তরমুজ, বেগুন, শিম, ধুন্দলসহ আরও কিছু সবজিতে ফেরোমেন ট্রাপ ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে পানি ছাড়াই ফেরোমেন ট্রাপ পদ্ধতি বাজারে চলে এসেছে। এগুলো দামে যেমন কম, ব্যবহারও সহজ। এ ছাড়া যেসব ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ফেরোমেন ট্রাপে ধ্বংস হয় না, সেগুলোর জন্য এখন ইয়োলো ট্রাপ নামে আরেকটি প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। তিনি বলেন, যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ও হৈবতপুর এলাকায় রপ্তানিযোগ্য পটোল উৎপাদিত হচ্ছে। এসব পটোলখেতে পোকার আক্রমণ ঠেকাতে ফেরোমেন ট্রাপ ও ইয়োলো ট্রাপ ছাড়া আর কিছুই ব্যবহৃত হয় না। খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, সরকার এ মেয়াদের মধ্যেই জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সংকল্প করেছে। সেই সংকল্প পূরণে কৃষি বিভাগও কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষতিকর পোকা দমনে কীটনাশকের বিকল্প ব্যবহারের প্রতি সবজিচাষিদের যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাতে চার বছরের মধ্যেই যশোরে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ সবজি নিরাপদ হিসেবে উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এসব সবজি ‘নিরাপদ’ ট্যাগ লাগানো প্যাকেটে বাজারজাত করার পরিকল্পনাও কৃষি বিভাগের রয়েছে বলে জানান খালিদ সাইফুল্লাহ। গতকাল সকালে সদর উপজেলার সাতমাইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে শিম, পটোল, লাউ, বেগুন, কুমড়া, ধুন্দল আর করলার খেত। চূড়ামনকাটি গ্রামের হাদিসুর রহমান তার আড়াই বিঘা জমিতে লাউ, পটোল আর মিষ্টিকুমড়ার চাষ করেছেন। এসব জমিতে সারি সারি বসানো আছে ফেরোমেন ট্রাপ। তিনি বলেন, ফেরোমেন ট্রাপ একবার স্থাপন করা হয়ে গেলে আর তেমন কোনো খরচ নেই। কীটনাশকের মতো বারবার এটার পেছনে ব্যয় করতে হয় না। ফলে এতে উৎপাদন খরচ যেমন কমে যায়, তেমনি বাজারে দামও পাওয়া যায় ভালো। একই গ্রামের চাষি নওয়াব আলী বলেন, তিনি তার সবজিতে ফেরোমেন ট্রাপ ও কীটনাশক দুটোই ব্যবহার করেন। ফেরোমেন ট্রাপ দিয়ে সব ধরনের পোকা মারা যায় না। বিশেষ করে পোকার ডিম নষ্ট করা যায় না। ডিম নষ্ট করতেই মাঝেমধ্যে কীটনাশক ¯ন্ডেপ্র করা লাগে, তবে তা পরিমাণে খুবই কম। তিনি বলেন, ফেরোমেন ট্রাপ ব্যবহারের কারণে তার কীটনাশক খরচ অনেক কমে গেছে। চূড়ামনকাটি এলাকার চাষি এনামুল হক বলেন, ‘এক সময় সরকার থেকে ফেরোমেন ট্রাপ দেওয়া হতো, তখন তা ব্যবহার করতাম। শীত মৌসুমে শিমের চাষ করার সময় ফেরোমেন ট্রাপ ব্যবহার করি। কিন্তু অনেক সবজিতে ফেরোট্রাপ ব্যবহারের পরও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। সে ক্ষেত্রে দ্বিগুণ খরচ হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরাও জানি আমাদের ছেলেমেয়েদের আমরা বিষাক্ত সবজি খাওয়াচ্ছি। আমরাও চাই সরকার এমন কোনো ব্যবস্থা করুক, যাতে আমরা পুরোপুরি বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করতে পারি এবং দেশের মানুষ সেই নিরাপদ সবজি খেতে পারে।’