যে শিক্ষা সমাজ পাল্টাবে

এই শিক্ষার্থীদের মতো অনেক মেয়েই পড়ছেন সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে । ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, নারী-পুরুষে সম্পর্ক, প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে চলছে পরিবার-সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি। সমাজবিজ্ঞান ও জেন্ডার স্টাডিজ এই ক্ষমতাকাঠামো বুঝতে, মানুষকে চিন্তা করতে ও প্রশ্ন করতে শেখায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো তৈরির পটভূমি ও একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের লড়াইয়ের কথা জানা, সমাজের বিবর্তন ও আজকের পরিবর্তিত অবস্থায় আসার পেছনের সংগ্রামটি বোঝার সূত্র গড়ে দেয় সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ।

‘সংস্কৃতিকে বাহন করে চলো এগিয়ে যাই। বদলাই নিজেকে, বদলাই সমাজকে।’ এই ব্রত নিয়ে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে চালু হয় সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ। রাজধানীর হাটখোলা রোডে অবস্থিত নারীদের এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

কী পড়ানো হয়?

বিভাগটির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জোবায়রা বিশ্বাস বলেন, ‘এখানে সোশিওলজি ও জেন্ডার স্টাডিজ—দুটি একসঙ্গে পড়ানো হয়। মানুষ, সমাজ, সমাজকাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, নারী–পুরুষের সমতা ও সমানাধিকার, মানবাধিকার ইত্যাদি এর মূল আলোচ্য বিষয়।’

জেন্ডার স্টাডিজে মূলত পড়ানো হয় নারী-পুরুষের বৈষম্য ও এর কারণ। বৈষম্যগুলো দেশের উন্নয়নের পথে বাধা। জেন্ডার স্টাডিজ তাই নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে আলোচনা করে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে চলমান বৈষম্যকে চিহ্নিত করে ও সমাধানের পথ দেখায়। সমাজকে, মানুষকে জানতে-বুঝতে হলে সমাজবিজ্ঞান ও জেন্ডার স্টাডিজ পড়া জরুরি।

বাংলাদেশ স্টাডিজ, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, উন্নয়ন, নারী নির্যাতন বন্ধ করা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো এই বিভাগের পড়ালেখার সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, নারীবাদের উদ্ভব ও বিকাশ, দেশ-বিদেশের নারী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, সাহিত্যে সমাজ ও জেন্ডারসহ জেন্ডারের বিস্তারিত বিষয় পাঠদান করা হয়।

সোশিওলজি ও জেন্ডার স্টাডিজের পাঠ্যসূচি বাস্তবসম্মত ও জীবনমুখী। ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রে যেন অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানো যায়, তাই ব্যবহারিক জীবনের বাস্তব উদাহরণ দিয়েই পড়ানো হয়।

চার বছরের স্নাতক করতে হলে ১২৬ ক্রেডিট সম্পন্ন করতে হয়, আর স্নাতকোত্তরের কোর্সের মেয়াদ এক বছর। প্রতিবছর জানুয়ারি ও জুলাই—এই দুই সেশনে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় মাধ্যমে পড়ার ও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ আছে। শিক্ষার্থীদের সার্বিক সহায়তা ও তত্ত্বাবধানের জন্য আছেন চেয়ারপারসনসহ পাঁচজন শিক্ষয়িত্রী। উল্লেখযোগ্য, এই বিভাগ থেকে সম্মানের সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিপ্রাপ্ত তরুণ ছাত্রী তাসফিয়া তানজিম বর্তমানে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন। এ ছাড়াও পাস করে অনেক ছাত্রী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন। প্রাক্তন ছাত্রীরা মিলে গড়ে তুলেছেন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, যা বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রেরণা জোগাতে ভূমিকা রাখছে।

সমাজ গড়ার শিক্ষা

শিক্ষার মাধ্যমে সমতা-সাম্য এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ পাঠদান করে। সমাজের কাঠামো, নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক, শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চলভেদে পার্থক্য, বৈষম্য, তার কারণ ও সমাধান বিশ্লেষণ করে পাঠ্যসূচি তৈরি করা হয়। সামাজিক মন্দ প্রবণতাগুলো দূর করার জন্য সৃজনশীল শিক্ষাসূচি তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা, সামাজিক কাজ ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। গবেষণা ও প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

নারী-পুরুষের চিন্তাভাবনা একেবারেই আলাদা করে তৈরি হয়। পরিবার ও সমাজ মানুষকে যে পুরোনো ধ্যানধারণা দেয়, সেসব ধারণা ভেঙে, সমাজের কুসংস্কার দূর করে আধুনিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দেয় সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ।

কোর্স শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও গঠনমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সচেতনতা বাড়াতে সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্ট, সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার ক্লাব’ বিভিন্ন সহ–শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই ক্লাবের মডারেটরের দায়িত্ব পালন করছেন বিভাগের শিক্ষক জোবায়রা বিশ্বাস। বিভিন্ন দিবস উদ্‌যাপন ছাড়াও ক্লাবের পক্ষ থেকে সামাজিক ও জেন্ডার ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা হয়। সচেতনতামূলক এবং ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।

শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা

বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করার পরও পড়াশোনা থেমে যায় জান্নাত আরা ফেরদৌসীর। বিয়ে ও সন্তান জন্মদান, পরিবারের দেখাশোনার কারণে প্রায় আট বছর পড়াশোনার বাইরে ছিলেন তিনি। তবে দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় তিনি শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। পাঠ্যবিষয় হিসেবে বেছে নেন সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ।

আট বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শুরু করতে তাঁকে সাহস জুগিয়েছে সেন্ট্রাল উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। এখানে সন্তানকে রেখে নিশ্চিন্তে পড়ায় মনোনিবেশ করতে পারেন তিনি। প্রথম সেমিস্টারে তাঁর ফল ছিল সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৩.৯১। দ্বিতীয় সেমিস্টারে তা বেড়ে ৩.৯৯ হয়। ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে পড়েও তিনি ভালো ফল করেন। সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজে পড়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কাজ, শিক্ষকতা, এমনকি সরকারি-বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ আছে। ভিনদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চাইলে সে দরজাও খোলা আছে শিক্ষার্থীদের জন্য। সামনের দিনগুলোতে এই শিক্ষার গুরুত্ব নিশ্চয়ই আরও বাড়বে।

সানজিদা ইসলাম পড়ছেন তৃতীয় বর্ষে প্রথম সেমিস্টারে। তিনি মনে করেন, সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ নিয়ে মানুষের ধারণা কম। এ বিষয়ে পড়ে সমাজে নারীদের অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞান লাভ করা যায়। সমাজে নারীর প্রতি চলমান পারিবারিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক নানান বৈষম্যের কারণ বোঝা যায়। বিশেষত সমাজে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, বৈষম্য, অধিকারহীনতা, হয়রানির মূল কারণ জানা যায়। এ বিষয় নিয়ে পড়ে নারীরা নিজের চলার পথের বাধা দূর করতে সক্রিয় হবেন।’