শিক্ষা বাজেটে সমস্যা ও সম্ভাবনা

ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান লিটু

এবার শিক্ষা বাজেট নিয়েই বোধ হয় বেশি আলোচনা হচ্ছে। কারণ বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তাকে টেকসই করার জন্য শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল এবারের বাজেটে শিক্ষা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এবারের বাজেটে ২৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে দায়িত্ব দিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে যুক্ত করে ২০১৯-২০ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটে মোট ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ১৬.৭৫ শতাংশ। এটা জিডিপির ৩.০৪ শতাংশ। ইউনেসকোর চাওয়া জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ। তা ছাড়া আমরা যদি এসডিজির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই, তাহলেও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এসডিজির চার নম্বর লক্ষ্যে শিক্ষার উন্নয়নের কথা বলা হলেও এটিই মূলত অন্য লক্ষ্যগুলো পূরণের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

বর্তমান বাজেটে দেশের উন্নয়নে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্পবিপ্লব-৪.০কে টার্গেট করা হয়েছে। কেননা বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পায়নের চর্তুথ স্তরে উন্নীত হয়েছে এবং সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা শিক্ষাপদ্ধতিকেও চতুর্থ স্তরে উন্নীত করেছে। বিশ্বের দরবারে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রয়াস বর্তমান বাজেটে উচ্চশিক্ষাকে শিল্পবিপ্লব-৪.০-এর জন্য তৈরি করার প্রয়াস ঘোষিত হয়েছে, যা সময়ের বিবেচনায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সাহসী পদক্ষেপ। কেননা এই শিল্পবিপ্লব-৪.০-এর সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে এডুকেশন ৪.০, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেণি পঠন-পাঠন থেকে শুরু করে শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণকে নিশ্চিত করে। এডুকেশনের বিভিন্ন জেনারেশন রয়েছে। শিক্ষা বিজ্ঞানে এই জেনারেশনসমূহ এডুকেশন ১.০, এডুকেশন ২.০, এডুকেশন ৩.০ ও এডুকেশন ৪.০ নামে পরিচিত। আধুনিক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা গ্রহণে অবশ্যই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এডুকেশন ৪.০-এ উত্তরণ ঘটবে। একই সঙ্গে শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরিতে বাজেটের বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন হবে। এবারের বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বাবদ ২৪ হাজার ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা ইতিমধ্যে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছি। অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ বছর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। এমপিও নীতিমালার সব শর্ত পূরণকারী যোগ্য দুই হাজার ৭৬২টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা এসেছে এই বাজেটে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে এই ঘোষণা খুবই আশাব্যঞ্জক। সারা দেশে ২৬ হাজার ২০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪৮ হাজার ৯৪৭টি মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ২০০টি ল্যাংগুয়েজ কাম আইসিটি ল্যাব, এক হাজারটি সায়েন্স ল্যাব, দুই হাজার ১২০টি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ৪৬টি হোস্টেল নির্মাণ ও আসবাব, অফিস সরঞ্জামাদি ও আইসিটি উপকরণ সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে।

এবারের বাজেটে আইন পাস হওয়া নতুন পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এতে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বাড়ছে এটা সত্য; কিন্তু সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার হার কম; কিন্তু বিশেষায়িত শিক্ষার্থীর হার অনেক বেশি। আমাদের দেশে ঠিক এর উল্টো দৃশ্যপট। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যুগের চাহিদা বিবেচনা করে বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এবারের বাজেটে নির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। আবার প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ও কলাবিদ্যার উন্নয়নের জন্য নির্দেশনা থাকাও বাঞ্ছনীয় ছিল। এবারের বাজেটেও উচ্চশিক্ষায় গবেষণার ওপর খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সংশোধিত বাজেটে বিভিন্ন খাতওয়ারি উচ্চশিক্ষার গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা উচিত।

শিক্ষার সঙ্গে বাজারের চাহিদার সংযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। এবারের বাজেটে সে বিষয়টি মাথায় রেখে কারিগরি শিক্ষার অগ্রগতির জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে। প্রাথমিক পর্যায়ে দুই হাজার ২৮১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০টি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুলের প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া ভূমি জরিপ শিক্ষা উন্নয়ন, ২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে চারটি বিভাগীয় শহরে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মাদরাসা শিক্ষায় এ বছর সর্বোচ্চ সাত হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল পাঁচ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। মাদরাসাগুলোতে ভোকেশনাল শিক্ষার প্রচলনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ একটি উদ্যোগ। এর ফলে মাদরাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাও দক্ষ জনসম্পদে পরিণত হবে।

জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষার উন্নয়নে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক্ষক আনার কথা বলা হয়েছে। বাইরে থেকে বিদেশিদের আনার আগে আমাদের দেশ থেকে যেসব মেধাবী চলে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আমাদের দেশের প্রচুর মেধাবী মানুষ এখন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় অনেক ভালো করছেন। আমরা কেন তাঁদের কাজে লাগাতে পারছি না? বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জাতির পিতাকে নিয়ে গবেষণা সেন্টার করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গবেষণার সংখ্যা অপ্রতুল। আশা করেছিলাম এবারের বাজেটে বঙ্গবন্ধু গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসবে। বাঙালি জাতিকে বঙ্গবন্ধুর আর্দশে দীক্ষিত করার জন্য এমন সেন্টারের কোনো বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন যে সুপারিশগুলো করেছিল, এত বছর পর হলেও সেই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন উদ্যোগ এবারের বাজেটে অনেকটাই প্রতিফলিত হয়েছে। তবে বাজেটের সঙ্গে সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার ও শিক্ষা-উদ্যোগগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে কঠোর তদারকির ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ এবং

শিক্ষার্থী উপদেষ্টা, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mahbubttc@gmail.com