ক্যাম্পাসের প্রিয়মুখ

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন চেনামুখকে নিয়ে লিখেছেন তানজিনা আকতারী
ফারাহ বিনতে বশির
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ফারাহ বিনতে বশির
শিক্ষকদের প্রেরণায় পথচলা
ফারাহ বিনতে বশিরকে কখনো দেখা যায় মাইক্রোফোনের সামনে, মঞ্চে, কখনো টেলিভিশনে। রেডিওতে ‘দেখা’ না হলেও তাঁর গলার স্বর শুনে চিনে নেওয়া যায়। শুধু সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্যই নয়, ব্যক্তি হিসেবেও বন্ধুদের কাছে তাঁর কত রকম পরিচয়! মিশুক, আমুদে, আড্ডাবাজ, খেয়ালি, অভিমানী, আবেগি, মানুষকে সহজে আপন করে নেওয়া মেয়েটিকে সবাই চেনে দোলন নামে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষে পড়ছেন ফারাহ। মায়ের হাত ধরে মাত্র তিন বছর বয়সে কচি–কাঁচার মেলায় গান, নাচ ও আবৃত্তি শেখার মধ্য দিয়ে শুরু। তখন থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি প্রবল ভালোবাসা ছিল মনে; বাংলা চর্চা, কবিতা, বিতর্ক, বই পড়া, সাহিত্যের রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি বিচরণ। ২০০৩-২০০৬ সাল পর্যন্ত আবৃত্তি ও গল্প বলায় চারবার জাতীয় শিশু শিল্পী পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এরপর আবৃত্তির সঙ্গে হাতে হাত রেখে পথচলা প্রায় ২০ বছর। বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ পাঠক, রেডিও ও টেলিভিশন উপস্থাপক, এ ছাড়া ফ্রিল্যান্স ভোকাল আর্টিস্ট হিসেবে কুড়িয়েছেন সুনাম। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আবৃত্তি ও উপস্থিত বক্তৃতার বিচারকাজের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

বাংলা সাহিত্যে পড়ার স্বপ্ন ছিল ফারাহর। কারণ, বাংলা সাহিত্য তাঁর ভালোবাসা আর কবিতা সংসার। স্বপ্ন পূরণে নিজেকে তৈরিও করেছিলেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে এক দুর্ঘটনায় বেছে নিতে হয় বিছানাবন্দী জীবন। ফলে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। সুস্থ হওয়ার পর বাসার কাছাকাছি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে গিয়েছিলেন মা। তৎকালীন ইংরেজি বিভাগের প্রধান তখন বলেছিলেন, ‘ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পড়লে বাংলা ভাষার প্রসারেই ভবিষ্যতে কাজ করার সুযোগ হবে। বিশ্ব সাহিত্য, অনুবাদ নিয়ে গবেষণা করা সহজ হবে, আমাদের নিজস্ব ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছে দিতে পারবে সহজেই।’ স্যারের কথা ভালো লেগে গিয়েছিল ফারাহর। সেই ক্ষণিকের আলাপেই ইংরেজি বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেও এত দিনের স্বপ্নের বিপরীতে গিয়ে অন্য ভাষায় লেখাপড়ার শুরুটা খুব একটা সহজ ছিল না।

ইংরেজি বিভাগ আর ইংরেজি সাহিত্যের প্রেমে পড়তে সাহায্য করেছেন আরও কয়েকজন প্রিয় শিক্ষক। ফারাহ বলেন, ‘মা ও নানি আমার প্রিয় মানুষ। এর বাইরে ছোটবেলা থেকেই জীবনে সবচেয়ে প্রভাব রেখেছেন আমার শিক্ষকেরা। তাই মা ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শিক্ষকতা এবং গবেষণাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছে আছে। শিক্ষক হয়ে প্রজন্মের মধ্যে আদর্শ আর বিশ্বাস ছড়ানোর স্বপ্ন দেখি। প্রজন্মের মন বুঝতে চাই যত্ন করে, পড়তে চাই আমার ছাত্রছাত্রীদের মনের ভাষা।’

অবসর কাটে বই পড়ে আর গান শুনে। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি। যেকোনো প্রয়োজনে বা বিপদে চেনা মানুষ খুঁজে ফেরেন তাঁকে। ভরসা করার মতো মানুষ বলেই ক্যাম্পাসের সবার চেনা মুখ ফারাহ বিনতে বশির।
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের ফারহানা নাসরিন
রাগবির রং
চঞ্চল, হাসিখুশি, দুরন্ত স্বভাবের ফারহানা নাসরিনকে মনে হবে যেন পাশের বাড়ির মেয়েটি। সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন, মাতিয়ে রাখেন চারপাশ। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের বস্ত্র পরিচ্ছদ ও বয়নশিল্প বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন তিনি।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। প্রতিবছর স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়ের সব কটি বিভাগের পুরস্কার ছিল তাঁর দখলে। অষ্টম শ্রেণি থেকে হাত পাকিয়েছেন হ্যান্ডবলে, আর ২০১৬ সাল থেকে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের ক্রীড়া শিক্ষকের উৎসাহে রাগবি খেলার শুরু। তার পর থেকে রাগবি দেখিয়েছে জীবনের নতুন পথ। শুরু থেকেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন রাগবি ফেডারেশনের কোচ মোহাম্মদ আবদুল কাদের সুমন।

বর্তমানে বাংলাদেশ রাগবি ফেডারেশন ইউনিয়নের লেভেল-১ কোচ ও রাগবি উন্নয়ন কর্মকর্তা ফারহানা নাসরিন। চমকপ্রদ একটি তথ্যও দিলেন তিনি, ‘২০১৮ সালে স্কুল রাগবি প্রতিযোগিতায় ফাইনালে ওঠে সেগুনবাগিচা হাইস্কুলের ছেলেদের রাগবি দল। ওদের কোচ ছিলাম আমি। বাংলাদেশ রাগবি ফেডারেশন ইউনিয়নের (বিআরএফইউ) ইতিহাসে আমিই প্রথম নারী কোচ, যাঁর দল স্কুল রাগবি প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হলো।’

এ ছাড়া স্কাউটিং করে ২০১৩ সালে ফারহানা অর্জন করেছেন বাংলাদেশ স্কাউটের সর্বোচ্চ সম্মাননা—‘প্রেসিডেন্টস স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’। এ বছর নেপালে অনুষ্ঠেয় ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম নেপাল ২০১৯–এ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের ক্যাডেট প্রতিনিধি তিনি।

নাসরিন বলেন, ‘রাগবি এখনো এ দেশে সেভাবে পরিচিত নয়। অন্যান্য খেলার মতো এই খেলায় মেয়েরা যেন সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, সে লক্ষ্যে মহিলা রাগবি নিয়ে কাজ করতে চাই দেশের প্রতিটি জেলায়।’

মঞ্চ ও টেলিভিশনে আবৃত্তি, নাচ, উপস্থাপনা, অভিনয় করেন ছোটবেলা থেকেই। এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় ক্যাম্পাসে খুব চেনা আর সবার মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন তিনি। অনেক গুণের অধিকারী ফারহানা পছন্দ করেন ভ্রমণ করতে। প্রিয় ব্যক্তিত্ব বাবার উৎসাহে সময় পেলেই ছুট দেন নদী, সমুদ্র, পাহাড় আর সবুজের টানে।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্যও কাজ করেছেন তিনি। ভবিষ্যতে জীবনের ছোট-বড় সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাজ করতে চান সমাজের হেরে যাওয়া লড়াকু মানুষদের জন্য। সেই সব মানুষকে নতুন করে বাঁচার ও জীবনকে উপভোগ করার স্বপ্ন দেখাতে চান তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে সরকারি চাকরিতে যোগদান করে দেশের সেবা করার ইচ্ছে তাঁর।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির তন্ময় বাগচি
প্রাণের ভেতর গান

‘আজ তন্ময়ের শো আছে, দেখিস।’
‘ওর কোনো প্রোগ্রাম আমি মিস করি না, এটাও দেখব।’

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দুই শিক্ষার্থীর আলাপচারিতায় তন্ময়ের পরিচয় কিছুটা পাওয়া গেল। এবার খুঁজে ফেরা সেই ছেলেকে। তন্ময় বাগচি। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন তিনি। দিনাজপুর জেলায় বেড়ে ওঠা তন্ময় স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে এবং একই জেলার হলি ল্যান্ড কলেজ থেকে চুকিয়েছেন কলেজজীবন।

লেখাপড়াকে কেন্দ্র করেই ঢাকায় আসা। ভালোবাসেন গান শুনতে, ভ্রমণ করতে, ছবি তুলতে, গিটার বাজাতে আর সেই সঙ্গে গাইতে। গানে দারুণ কণ্ঠ তন্ময়ের। গান দিয়েই জয় করে নিয়েছেন সবার মন, পেয়েছেন পরিচিতি, হয়ে উঠেছেন প্রিয় মুখ। প্রাইমারির গণ্ডি পেরোনোর পর থেকেই গানের শুরু। যে গান শুনে ভালো লাগত, নিজে নিজেই গাওয়ার চেষ্টা করতেন সব সময়। শিখতেন গিটার, তাই সুর তোলা ও গান গাওয়া ছিল ভালো লাগার বিষয়। সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মায়ের আগ্রহে ডালপালা মেলেছে গান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই যুক্ত হয়েছেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি কালচারাল ক্লাবের সঙ্গে। সেই ক্লাবের পারফরম্যান্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান ছিলেন তিনি। মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন—সব মাধ্যমে গান পরিবেশন করে যাচ্ছেন সফলতার সঙ্গে। নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আন্তবিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পেয়েছেন বিজয়।

‘আমি সাধারণত ক্ল্যাসিক্যাল গান করতে পছন্দ করি। আর অর্ণব ভীষণ প্রিয় বলেই তাঁর গান আমি অনুসরণ করি, তাঁর গানই ছোটবেলা থেকে আমার প্রেরণা,’ বলছিলেন তন্ময়। সুযোগ পেলে তন্ময়ের ইচ্ছে কোনো গুরুর কাছে তালিম
নেওয়ার। পড়াশোনা শেষে চাকরি করলেও গানকে নিয়ে যেতে চান দেশের গণ্ডির বাইরে, আর সেই
সঙ্গে শ্রোতাদের উপহার দিতে চান ভালো গান।

এত ব্যস্ততার ফাঁকে যে কেউ লেখাপড়া কিংবা গান বিষয়ে যেকোনো সাহায্য চাইলে হাসিমুখে সাহায্য করার চেষ্টা করেন এই গানের মানুষ। আড্ডাবাজ, আমুদে তন্ময় তাই হয়ে উঠেছেন প্রিয় শিল্পী, প্রিয় বন্ধু, প্রিয় মুখ।